ফ্রান্সের ২৫টি শহরে বাস্তব লোকেশনে চলছে শুটিং। মঙ্গলবার দুপুরে পরিচালক স্বপন আহমেদের সঙ্গে যখন কথা হচ্ছিল, তখনো নতুন শুটিং লোকেশনের দিকে ছুটছিল তাঁদের গাড়ি। আগের দিন বাংলাদেশ সময় মধ্যরাতে শুটিংয়ের ফাঁকে কয়েক মিনিট কথা হয়েছিল। তিনি জানিয়েছিলেন, রাত ১০টা পর্যন্ত শুটিং চলবে। পরদিন ভোরেই আবার শিল্পীদের কলটাইম। ফলে ফোনে তাঁদের পাওয়া কঠিন হয়ে পড়ে। পরে জানা গেল, সবাই একসঙ্গে রওনা হয়েছেন দূরের লোকেশনে। দীর্ঘ সেই যাত্রার ফাঁকেই ছবির কলাকুশলী ও অভিনয়শিল্পীদের সঙ্গে কথা হলো।
বাংলাদেশ-ফ্রান্সের যৌথ প্রযোজনায় নির্মিত হচ্ছে ‘দ্য অরেঞ্জ’, বাংলা নাম ‘পথের বন্ধু’। স্বপন আহমেদের ছবিটিতে প্রধান চরিত্রে অভিনয় করছেন তৌকীর আহমেদ, ফাইজুল ইয়ামীন ও স্বর্ণালি চৈতী। ফ্রান্সের শুটিংয়ের জন্য আলাদা কোনো সেট তৈরি করছেন না স্বপন। নদীর পাড়ের বেঞ্চ, রাস্তার পাশ, ছোট শহরের পথ কিংবা চলন্ত গাড়ি—যেখানে গল্পের প্রয়োজন, সেখানেই ক্যামেরা বসছে। এক শহর থেকে আরেক শহরে যেতে যেতে বদলে যাচ্ছে দৃশ্যপট, সিনেমার অংশ হয়ে উঠছে নতুন নতুন জনপদ।
জানতে চাইলে তৌকীর আহমেদ বলেন, তাঁদের শুটিংয়ের বেশির ভাগই শহরের বাইরে। বাংলাদেশের তুলনা টেনে হাসতে হাসতে বললেন, ‘প্যারিসের শাহবাগে না, আমরা সাভার, পুবাইল, রংপুর, কক্সবাজারে শুটিং করছি।’
স্বপন আহমেদ জানালেন, ফ্রান্সকে পর্যটকদের পোস্টকার্ডের মতো করে দেখাতে চান না তিনি। ছবিতে যেমন আইফেল টাওয়ারের কোনো দৃশ্যই থাকছে না। পরিচালকের আগ্রহ মানুষের প্রতিদিনের ফ্রান্স। তাই ছবির লোকেশন হিসেবে বেছে নেওয়া হয়েছে রাস্তাঘাট, বাজার, ছোট শহর, গ্রাম ও উপকূল। তিনজন অভিবাসীর যাত্রার সঙ্গে শহর থেকে গ্রাম, তারপর সমুদ্র—ফ্রান্সের নানা ভূপ্রকৃতিও গল্পের অংশ হয়ে উঠবে।
বাস্তব লোকেশনে শুটিংয়ের চ্যালেঞ্জও কম না। প্রতিদিন নতুন জায়গায় যেতে হচ্ছে, সামলাতে হচ্ছে দীর্ঘ যাত্রা ও সময়ের হিসাব। তবে স্থানীয় প্রশাসন, সিটি করপোরেশন ও পুলিশের সহযোগিতায় কাজটি সহজ হচ্ছে বলে জানালেন পরিচালক। যে শহরে শুটিং হচ্ছে, সেখানকার মেয়রও কখনো কখনো উপস্থিত থাকছেন।
‘পথের বন্ধুর’ গল্পের কেন্দ্রে রয়েছেন প্রবাসী বাঙালি নাসির। ফ্রান্সে কষ্ট করে দিনযাপন করেন। খেলনা বিক্রি তাঁর পেশা। প্যারিসে থাকলেও খেলনা বিক্রি করতে তাঁকে যেতে হয় শহর থেকে ২০০–৩০০ কিলোমিটার দূরে। তাঁর সহকারী শৈবাল চরিত্রে অভিনয় করছেন ফাইজুল ইয়ামীন। আর নদী চরিত্রে রয়েছেন স্বর্ণালি চৈতী।
গল্প প্রসঙ্গে পরিচালক স্বপন আহমেদ জানালেন, নব্বইয়ের দশকে বাংলাদেশের কুড়িগ্রামের একটি পরিবারের গল্প। নদীভাঙনে বিলীন হয়ে যায় তাদের গ্রাম। ১২ বছর পর দেশে ফিরে নাসির দেখতে পান বদলে যাওয়া এক বাস্তবতা। গল্পের একপর্যায়ে প্যারিসের রাস্তায় তাঁর সঙ্গে ঘটনাচক্রে নদীর দেখা হয়। পরে দর্শক জানতে পারবেন, মেয়েটিই নাসিরের মেয়ে। তবে কীভাবে এই সম্পর্কের সূত্র মেলে, সেটিই ছবির গল্পের গুরুত্বপূর্ণ রহস্য।
তৌকীর আহমেদের কাছে নাসির চরিত্রটি নতুন অভিজ্ঞতা। তৌকীর বলেন, ‘দর্শক তো আমাকে নানাভাবে দেখেছেন। সেই ক্ষেত্রে শিল্পীর একটা ইমেজও তৈরি হয়ে যায়। বন্দী হয়ে যায় শিল্পী। সেখান থেকে বেরিয়ে ভালো চরিত্রে কাজ করাটা অবশ্যই চ্যালেঞ্জিং।’ তাঁর মতে, চরিত্রের শুধু বাহ্যিক রূপ নয়, আত্মাটাও খুঁজে পাওয়া জরুরি।
‘জালালের গল্প’, ‘কমলা রকেট’ কিংবা ‘রূপকথার গল্প’র মতো ভিন্নধর্মী ছবিতে অভিনয়ের অভিজ্ঞতা তৌকীরের রয়েছে। এবার ইউরোপীয় কলাকুশলীদের সঙ্গে কাজ করাও নতুন করে শেখার সুযোগ করে দিচ্ছে।
ফাইজুল ইয়ামীন ও স্বর্ণালি চৈতীর জন্যও ‘পথের বন্ধু’ অন্য রকম অভিজ্ঞতা। ফাইজুলের এটি তৃতীয় চলচ্চিত্র। এর আগে রায়হান রাফীর ‘প্রেশার কুকার’ ও ওয়াহিদ আনামের ‘তাজমহল’ সিনেমায় অভিনয় করেছেন তিনি। ফ্রান্সে প্রথমবার এসে প্রতিদিন নতুন জায়গায় শুটিং করার অভিজ্ঞতা তাঁর কাছে অনেকটা ভ্রমণের মতো, ‘শুধু শুটিং নয়, মনে হচ্ছে, ফ্রান্সটাও দেখা হচ্ছে।’ পরিচালক স্বপন আহমেদের কাজের ধরনও তাঁকে আকৃষ্ট করেছে। তাঁর মতে, স্বপন আহমেদ অভিনয়ের জন্য পর্যাপ্ত জায়গা দেন। চরিত্র ও দৃশ্য নিয়ে নিজেদের মধ্যে আলোচনা করার সুযোগ রয়েছে। প্রতিদিনই নতুন কিছু শেখার অভিজ্ঞতা হচ্ছে।
স্বর্ণালি চৈতীর এটি পঞ্চম চলচ্চিত্র। প্রথম অভিনয় করেন এর আগে রতন পালের ‘অন্তরখোলা’ চলচ্চিত্রে। এরপর একে একে অভিনয় করেন নুর ইমরান মিঠুর ‘কুরকাব’, এন রাশেদ চৌধুরীর ‘সখী রঙ্গমালা’ ও রায়হান রাফীর ‘আন্ধার’। ‘পথের বন্ধু’ দিয়ে দেশের বাইরে প্রথমবারের মতো সিনেমার শুটিং করছেন। আর ছবির নারী নির্বাহী প্রযোজক মালিহা আহমেদের আন্তরিক সহযোগিতায় বিদেশে থেকেও নিজের মানুষদের কাছাকাছি থাকার অনুভূতি পাচ্ছেন বলে জানালেন তিনি। স্বর্ণালি বললেন, ‘মনে হচ্ছে না, দেশের বাইরে কোথাও শুটিংয়ে আছি। মনে হচ্ছে, আপন কেউ আগলে রাখছেন।’
‘লাল টিপ’ ও ‘পরবাসিনী’র পর স্বপন আহমেদের তৃতীয় চলচ্চিত্র ‘পথের বন্ধু’। আগের দুটি সিনেমায় বাণিজ্যিক ধারায় কাজ করলেও এবার নিজের পছন্দের চলচ্চিত্রভাষায় গল্প বলতে চান তিনি। প্রবাসজীবনের বাস্তবতা, সংগ্রাম ও মানুষের সম্পর্ককে কেন্দ্র করে ছবিটি তৈরি হচ্ছে।