আগামী পয়লা ডিসেম্বর থেকে তৈরি পোশাকশিল্পের শ্রমিকদের নতুন নিম্নতম মজুরি কার্যকর করার বিষয়ে একমত হয়েছেন মালিক ও শ্রমিকপক্ষের প্রতিনিধিগণ। সে অনুযায়ী, জানুয়ারিতে ডিসেম্বর মাসের বেতনের সঙ্গে নতুন কাঠামোর বর্ধিত মজুরি পাবেন শ্রমিকেরা।
আজ বুধবার রাজধানীর সেগুনবাগিচায় নিম্নতম মজুরি বোর্ডের কার্যালয়ে তৈরি পোশাকশিল্পের শ্রমিকদের জন্য গঠিত অষ্টম নিম্নতম মজুরি বোর্ডের প্রথম সভা শেষে মালিক ও শ্রমিকপক্ষের প্রতিনিধিগণ সাংবাদিকদের এ তথ্য জানান।
সভায় শ্রমিকপক্ষের প্রতিনিধি ও বাংলাদেশ গার্মেন্টস অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিয়াল শ্রমিক ফেডারেশনের সাধারণ সম্পাদক বাবুল আখতার বলেন, নতুন মজুরি পয়লা ডিসেম্বর থেকে কার্যকর এবং জানুয়ারিতে ডিসেম্বর মাসের বেতনের সঙ্গে শ্রমিকদের তা পরিশোধের বিষয়ে মালিকপক্ষের প্রতিনিধির সঙ্গে তাঁদের ঐকমত্য হয়েছে। এ বিষয়ে দুই পক্ষের মধ্যে কোনো মতপার্থক্য নেই।
তিনি বলেন, শ্রমিকদের পক্ষ থেকে ডিসেম্বরের মধ্যে নতুন মজুরি নির্ধারণের কার্যক্রম সম্পন্ন করার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। পরবর্তী সভায় শ্রমিকপক্ষের লিখিত প্রস্তাব জমা দেওয়া হবে। সব শ্রমিক সংগঠনকে ঐক্যবদ্ধভাবে একটি যৌক্তিক মজুরি প্রস্তাব তৈরি করে বোর্ডে উপস্থাপনের আহ্বান জানান তিনি।
মালিকপক্ষের প্রতিনিধি ও বাংলাদেশ তৈরি পোশাক প্রস্তুতকারক ও রপ্তানিকারক সমিতির (বিজিএমইএ) পরিচালক এ বি এম সামছুদ্দিনও ডিসেম্বরের মধ্যে নতুন মজুরি নির্ধারণের কার্যক্রম সম্পন্ন করার বিষয়ে ঐকমত্যের কথা জানান।
তিনি বলেন, মালিক ও শ্রমিকপক্ষ অত্যন্ত সৌহার্দ্যপূর্ণ পরিবেশে আলোচনা করেছে। উভয় পক্ষের সম্মতিতে ডিসেম্বরের মধ্যে এ কার্যক্রম শেষ করার বিষয়ে ঐকমত্য তৈরি হয়েছে, যেন শ্রমিকেরা জানুয়ারিতে ডিসেম্বর মাসের বেতনের সঙ্গে বর্ধিত মজুরি পান।
সভায় সভাপতিত্ব করেন নিম্নতম মজুরি বোর্ডের চেয়ারম্যান শেখ আশফাকুর রহমান। সভা শেষে তিনি বলেন, গত পয়লা নভেম্বর সরকার তৈরি পোশাকশিল্পের জন্য নতুন মজুরি বোর্ড গঠন করেছে। বোর্ড গঠনের মাত্র তিন দিনের মধ্যে প্রথম সভা অনুষ্ঠিত হওয়ায় মজুরি নির্ধারণের কার্যক্রম দ্রুত শুরু করা সম্ভব হয়েছে।
শেখ আশফাকুর রহমান বলেন, সভায় বোর্ড সদস্যদের পরিচিতি পর্বের পাশাপাশি মজুরি নির্ধারণের আইনগত পদ্ধতি ও করণীয় বিষয়ে আলোচনা হয়েছে। মালিক ও শ্রমিকপক্ষের প্রতিনিধিগণ তাঁদের অভিজ্ঞতা ও মতামত তুলে ধরেছেন। পরবর্তী সভায় উভয় পক্ষের কাছ থেকে লিখিত প্রস্তাব পাওয়া যাবে বলে আশা করা হচ্ছে।
আগামী সপ্তাহে বোর্ডের পরবর্তী সভা আয়োজনের পরিকল্পনা রয়েছে জানিয়ে তিনি বলেন, সাধারণত শিল্প খাতের নিম্নতম মজুরি নির্ধারণের জন্য ছয় মাসের একটি সময়সীমা থাকে। তবে বর্তমান সরকার দ্রুততম সময়ে বোর্ড গঠন করেছে। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে সরকারের কাছে সুপারিশ প্রণয়ন ও তা জমা দেওয়া সম্ভব হবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।
শ্রমিকদের উদ্দেশে শেখ আশফাকুর রহমান বলেন, বোর্ডের সদস্যরা শ্রমিকদের স্বার্থ বিবেচনায় নিয়েই কাজ করছেন। আজকের সভায় মালিক ও শ্রমিক উভয় পক্ষের প্রতিনিধিগণ অত্যন্ত আন্তরিকতার সঙ্গে তাঁদের মতামত দিয়েছেন। বোর্ডের সুপারিশ শ্রমিকদের প্রত্যাশার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।
সভায় শ্রমিক প্রতিনিধিগণ মজুরি ছাড়াও শ্রমিকদের বিভিন্ন সমস্যা তুলে ধরেন। এর মধ্যে শ্রম আইন বাস্তবায়ন, ট্রেড ইউনিয়নের অধিকার, ছুটি ও অন্যান্য সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করার বিষয় রয়েছে। এসব সমস্যা পর্যায়ক্রমে সমাধানে সরকারের দৃষ্টি আকর্ষণ করেন তাঁরা।
শ্রমিক প্রতিনিধি বাবুল আখতার বলেন, মজুরি নির্ধারণের পাশাপাশি শ্রমিকদের অন্যান্য অধিকার ও সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করাও জরুরি। শ্রমিক নেতাদের বিরুদ্ধে হয়রানিমূলক ব্যবস্থা না নেওয়া, গ্রেপ্তার হওয়া শ্রমিক ও শ্রমিক নেতাদের মুক্তি এবং তাঁদের প্রতি কোনো ধরনের নির্যাতন না করার জন্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের প্রতি আহ্বান জানান তিনি।
কারখানায় উৎপাদন স্বাভাবিক রাখতে শ্রমিকদের প্রতি আহ্বান জানিয়ে বাবুল আখতার বলেন, নিম্নতম মজুরি নির্ধারণের দায়িত্ব সরকারের মজুরি বোর্ডের। শ্রমিকদের ন্যায্য পাওনা নিশ্চিত করতে মালিক ও শ্রমিকপক্ষ একসঙ্গে কাজ করতে চান। এ জন্য কারখানার উৎপাদন বন্ধ রেখে আন্দোলন না করে আলোচনার মাধ্যমে সমস্যার সমাধানে এগিয়ে আসার আহ্বান জানান তিনি।
উল্লেখ্য, তৈরি পোশাকশিল্পের শ্রমিকদের নতুন নিম্নতম মজুরি নির্ধারণে গত ১ নভেম্বর ছয় সদস্যের বোর্ড গঠন করে সরকার। শ্রমিকদের মজুরি বৃদ্ধির দাবিতে বিভিন্ন শিল্পাঞ্চলে অসন্তোষের পরিপ্রেক্ষিতে এ উদ্যোগ নেওয়া হয়। নতুন বোর্ডকে মালিক, শ্রমিক ও নিরপেক্ষ সদস্যদের সঙ্গে আলোচনা করে শ্রমিকদের নিম্নতম মজুরির সুপারিশ প্রণয়নের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে।