মিৎসুই অ্যান্ড কোম্পানি (এশিয়া প্যাসিফিক) প্রাইভেট লিমিটেডের ঢাকা শাখার শাখা মহাব্যবস্থাপক ও কান্ট্রি চেয়ারপারসন কেনিচিরো কাওয়ামোতো ‘টুগেদার ফর আ ব্রাইটার বাংলাদেশ’ শীর্ষক উপস্থাপনা দেন।
এ ছাড়া, ওয়াইকেকে করপোরেশনের গ্লোবাল সেলস হেডকোয়ার্টার্সের ভাইস প্রেসিডেন্ট রেইসুকে আরাতানি বাংলাদেশে প্রতিষ্ঠানটির ব্যবসায়িক কার্যক্রমের অগ্রযাত্রা ও ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা তুলে ধরেন।
অনুষ্ঠানে বাংলাদেশের উচ্চ প্রবৃদ্ধির সম্ভাবনাময় ব্যবসায়িক খাত নিয়ে বক্তব্য দেন প্রধানমন্ত্রীর ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তি এবং বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিবিষয়ক উপদেষ্টা রেহান আসিফ আসাদ।
এতে বাংলাদেশ ও জাপানের ব্যবসায়ী নেতারা অংশ নেন এবং বিনিয়োগের সম্ভাবনা ও ভবিষ্যৎ অর্থনৈতিক সহযোগিতা নিয়ে আলোচনা করেন।
অনুষ্ঠানে জেট্রোর প্রেসিডেন্ট সুসুমু কাতাওকা উদ্বোধনী বক্তব্য দেন। অতিথি বক্তা হিসেবে বক্তব্য দেন জাপানের অর্থনীতি, বাণিজ্য ও শিল্পবিষয়ক সংসদীয় উপমন্ত্রী শিনজি ওয়াকায়ামা।
এ সময় সমঝোতা স্মারক (এমওইউ) বিনিময় এবং বিনিয়োগ ও সহযোগিতামূলক প্রকল্পের ঘোষণা দেওয়া হয়।
বাংলাদেশে বিনিয়োগনির্ভর অর্থনীতি গড়ে তোলার বিষয়ে বক্তব্য দেন অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী।
অন্যদিকে, বাংলাদেশে বিনিয়োগ সহজতর করতে গৃহীত সংস্কার ও নতুন উদ্যোগগুলো তুলে ধরেন ইনভেস্ট বাংলাদেশ কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান চৌধুরী আশিক মাহমুদ বিন হারুন।
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বাংলাদেশের পাঁচ অগ্রাধিকার খাতে বিনিয়োগ করতে জাপানি কোম্পানিগুলোর প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন।
আজ টোকিওতে স্থানীয় সময় বিকেলে জেট্রো হলে বাংলাদেশ-জাপান অর্থনৈতিক ফোরাম সংলাপে মূল বক্তব্যে প্রধানমন্ত্রী এ আহ্বান জানান। তিনি বলেন, ‘পারস্পরিক স্বার্থ ও সুবিধার ভিত্তিতে ভবিষ্যৎ সহযোগিতা এবং ব্যবসায়িক সুযোগ সৃষ্টির জন্য আমি জাপানি কোম্পানিগুলোকে পাঁচটি গুরুত্বপূর্ণ খাত বিবেচনা করার অনুরোধ জানাচ্ছি।’
উল্লেখ্য, খাতগুলো হলো—মোটরযান উৎপাদন, জ্বালানি, প্রযুক্তি ও মহাকাশ সহযোগিতা, রেলপথ ও সরবরাহ ব্যবস্থা এবং কৃষিপণ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ ও উৎপাদনশিল্প।
দু’দেশের অর্থনৈতিক সম্পর্কের অপার সম্ভাবনার কথা তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘বর্তমানে বাংলাদেশে প্রায় ৩৫০টি জাপানি কোম্পানির কার্যক্রম চলছে। তবে বাংলাদেশে জাপানের প্রত্যক্ষ বিনিয়োগের পরিমাণ এখনো ৫০ কোটি মার্কিন ডলারের কম। সর্বশেষ অর্থবছরে জাপানে বাংলাদেশের রপ্তানি আয় ছিল ১৩৬ কোটি মার্কিন ডলার। একই সময়ে জাপান থেকে বাংলাদেশ ২১৬ কোটি মার্কিন ডলারের পণ্য আমদানি করেছে।’
মোটরযান উৎপাদনকে প্রথম অগ্রাধিকার হিসেবে উল্লেখ করে তারেক রহমান বলেন, চলতি মাসের শুরুর দিকে টয়োটা বাংলাদেশে একটি যানবাহন উৎপাদন কারখানা স্থাপনের কাজ শুরুর পরিকল্পনার কথা জানিয়েছে। ২০২৯ সালের মধ্যে পূর্ণাঙ্গ উৎপাদন শুরুর লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। তিনি এ উদ্যোগকে স্বাগত জানিয়ে টয়োটাকে সরকারের পক্ষ থেকে সম্ভাব্য সব ধরনের সহযোগিতার আশ্বাস দেন।
জ্বালানি খাতে তিনি জাপানি কোম্পানিগুলোকে তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) অবকাঠামো, দক্ষ গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদন এবং নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতে বিনিয়োগের আহ্বান জানান। তিনি বলেন, গ্যাস, বিদ্যুৎ ও সামগ্রিক জ্বালানি খাতের উন্নয়নে বাংলাদেশের স্বল্প, মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা রয়েছে।
উন্নয়ন সহযোগিতার গণ্ডি পেরিয়ে বাণিজ্য ও বিনিয়োগ সম্প্রসারণের ওপর গুরুত্বারোপ করে তিনি বলেন, দু’দেশের সম্পর্ককে আরও উচ্চতর পর্যায়ে নিয়ে যাওয়ার সময় এসেছে।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, আজ আমি আগামী ৩০ থেকে ৫০ বছরের অংশীদারত্ব ও সহযোগিতা নিয়ে কথা বলতে চাই।
দু’দেশের দীর্ঘদিনের বন্ধুত্বের কথা স্মরণ করে তারেক রহমান বলেন, ১৯৭২ সালের ফেব্রুয়ারিতে বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দেওয়া প্রথম দেশগুলোর একটি ছিল জাপান। পাঁচ দশকেরও বেশি সময় ধরে দেশটি বাংলাদেশের বৃহত্তম উন্নয়ন সহযোগী হিসেবে ভূমিকা পালন করছে। তিনি তাঁর বাবা শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান এবং প্রয়াত প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার অবদানের কথা স্মরণ করে বলেন, তাঁরা একাধিকবার জাপান সফর করেছেন এবং দুই দেশের দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক আরও গভীর করতে ভূমিকা রেখেছেন।
তারেক রহমান বলেন, চলতি বছর বাংলাদেশ ও জাপানের মধ্যে অর্থনৈতিক অংশীদারত্ব চুক্তি (ইপিএ) স্বাক্ষরিত হয়েছে। বাংলাদেশের সঙ্গে কোনো দেশের এটিই প্রথম এ ধরনের চুক্তি। এর আওতায় বাংলাদেশের ৭ হাজার ৩৭৯টি পণ্য জাপানের বাজারে শুল্কমুক্ত প্রবেশাধিকার পাবে। অন্যদিকে, ইস্পাত, মোটরযানের যন্ত্রাংশ ও ইলেকট্রনিক উপাদানসহ জাপানি পণ্য বাংলাদেশে অগ্রাধিকারমূলক বাজার সুবিধা পাবে।
বিনিয়োগের সম্ভাবনা তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ১৮ কোটিরও বেশি মানুষের বাজার, ২৭ বছরের মধ্যম বয়সের উদ্যমী তরুণ শ্রমশক্তি এবং ক্রমবর্ধমান মধ্যবিত্ত শ্রেণি বাংলাদেশের বড় সম্পদ। ২০৩০ সালের মধ্যে বাংলাদেশ বিশ্বের শীর্ষ ১০টি ভোক্তা অর্থনীতির একটি হয়ে উঠবে বলে আশা করা হচ্ছে।
এ ছাড়া, আড়াইহাজারে অবস্থিত বাংলাদেশ বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চলে বিনিয়োগের জন্য জাপানি কোম্পানিগুলোর প্রতি আহ্বান জানান তিনি।
সুমিতোমো করপোরেশন জাপানি মানদণ্ড অনুসরণ করে এ অর্থনৈতিক অঞ্চলটি গড়ে তুলছে।
জাপানি কোম্পানিগুলোর উত্থাপিত উদ্বেগের বিষয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, নির্ভরযোগ্য জ্বালানি সরবরাহ, দক্ষ অবকাঠামো এবং শুল্ক ছাড় ও করব্যবস্থায় পূর্বানুমানযোগ্যতা নিশ্চিত করার বিষয়গুলো সরকার গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করছে। তিনি বলেন, ‘আমরা তাদের উদ্বেগের কথা শুনেছি। এসব সমস্যার সমাধান এবং আরও ভালো ফলাফল নিশ্চিত করতে কাজ করছি।’
প্রধানমন্ত্রী আরও বলেন, ‘আমি পুরোপুরি বুঝতে পারি, ব্যবসা পরিচালনার জন্য নিশ্চয়তা প্রয়োজন। বিনিয়োগকারীদের প্রয়োজন আস্থা। এই দুটো নিশ্চিত করার উপযোগী পরিবেশ তৈরি করাই আমাদের দায়িত্ব।’
জাপানি কোম্পানিগুলো এসব পরিকল্পনার আওতায় বিনিয়োগের সুযোগ অনুসন্ধান করতে পারে। এ খাতে বাংলাদেশ জেরা (JERA)-এর সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করছে বলেও তিনি উল্লেখ করেন।
রেলপথ ও সরবরাহব্যবস্থাকে আরেকটি অগ্রাধিকার খাত হিসেবে উল্লেখ করে তারেক রহমান বলেন, ঢাকা, চট্টগ্রাম, সিলেট, রাজশাহী, খুলনা ও বরিশালসহ দেশের প্রধান শহরগুলোকে সংযুক্ত করে দেশব্যাপী উড়ালপথে উচ্চগতির রেল নেটওয়ার্ক গড়ে তোলার পরিকল্পনা করছে বাংলাদেশ।
এ উদ্যোগের জন্য জাতীয় রেল নেটওয়ার্কের মাস্টারপ্ল্যান প্রণয়ন, যাত্রী ও পণ্য পরিবহনের চাহিদা বিশ্লেষণ, রুটের অগ্রাধিকার নির্ধারণ এবং সম্ভাব্যতা সমীক্ষা পরিচালনাসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে জাপানি প্রতিষ্ঠানগুলোর কারিগরি ও বিনিয়োগ সহায়তাকে স্বাগত জানান তিনি।
কৃষিপণ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ ও উৎপাদনশিল্পের সম্ভাবনার কথা তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রী বলেন, বাংলাদেশে বিভিন্ন ধরনের ফসল, ফলমূল ও শাকসবজি উৎপাদিত হয়। জাপানি কোম্পানিগুলো দেশে খাদ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ শিল্পে বিনিয়োগের সুযোগ অনুসন্ধান করতে পারে।
দুই দেশের জনগণের মধ্যে সম্পর্ক ও দক্ষতা উন্নয়নের ওপর গুরুত্বারোপ করে তারেক রহমান বলেন, প্রতিবছর বাংলাদেশের শিক্ষার্থীরা উচ্চশিক্ষা গ্রহণ এবং মূল্যবান দক্ষতা ও অভিজ্ঞতা অর্জনের জন্য জাপানে আসেন। পরে দেশে ফিরে তাঁরা অর্জিত জ্ঞান ও অভিজ্ঞতা কাজে লাগান। তিনি বলেন, বাংলাদেশের শিক্ষার্থীদের জাপানি ভাষা শেখানোকে সরকার অগ্রাধিকার দিচ্ছে। কারিগরি দক্ষতার পাশাপাশি লাখ লাখ তরুণকে জাপানি ভাষায় দক্ষ করে তোলার পরিকল্পনা রয়েছে।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, জাপানি ভাষায় দক্ষ বাংলাদেশি পেশাজীবীরা বাংলাদেশ ও জাপান—উভয় দেশের কর্মসংস্থানের চাহিদা পূরণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারবেন। তিনি বলেন, ‘বাংলাদেশের উন্নয়নের ভিত্তি গড়ে তোলার সময় জাপান আমাদের পাশে ছিল। এখন আমরা আপনাদের আমাদের শিল্পকারখানা গড়ে তোলা, নতুন সুযোগ সৃষ্টি এবং একসঙ্গে এগিয়ে যাওয়ার আমন্ত্রণ জানাচ্ছি।’
প্রধানমন্ত্রী আরও বলেন, ‘আসুন, দীর্ঘদিনের বন্ধুত্বকে আরও শক্তিশালী অংশীদারত্বে রূপান্তর করি। আমাদের জনগণের জন্য পারস্পরিক সুযোগ সৃষ্টি ও উভয় দেশের সমৃদ্ধি নিশ্চিত করি।’
বাংলাদেশ দূতাবাসের সহযোগিতায় জাপান বৈদেশিক বাণিজ্য সংস্থা (জেট্রো) ও জাপান-বাংলাদেশ বাণিজ্য ও অর্থনৈতিক সহযোগিতা কমিটির (জেবিসিসিইসি) যৌথ আয়োজনে এ সংলাপ অনুষ্ঠিত হয়।