নেত্রকোনার হাওরাঞ্চলের মানুষের জীবনমান উন্নয়ন, স্বাস্থ্যসেবা, শিক্ষা ও কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টিতে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ও দপ্তরের সমন্বয়ে বিশেষ টাস্কফোর্স গঠনের আহ্বান জানিয়েছেন জাতীয় সংসদের ডেপুটি স্পিকার কায়সার কামাল। তিনি বলেছেন, হাওরাঞ্চলের রয়েছে বিপুল প্রাকৃতিক ও অর্থনৈতিক সম্ভাবনা। মৎস্যসম্পদ, কৃষি, জীববৈচিত্র্য ও পর্যটনকে কেন্দ্র করে পরিকল্পিত উন্নয়ন কার্যক্রম গ্রহণ করা গেলে স্থানীয় জনগোষ্ঠীর কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং জীবনমানের উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন সম্ভব।
আজ বুধবার জাতীয় সংসদ ভবনে ডেপুটি স্পিকারের কার্যালয়ে র্যামন ম্যাগসেসে পুরস্কার-২০২৬ প্রাপ্ত বিশিষ্ট সমাজকর্মী ও বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা ফ্রেন্ডশিপের প্রতিষ্ঠাতা ও নির্বাহী পরিচালক রুনা খানের সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎকালে তিনি এসব কথা বলেন।
সংসদ সচিবালয় থেকে পাঠানো সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এ তথ্য জানানো হয়।
সাক্ষাৎকালে ডেপুটি স্পিকার রুনা খানকে আন্তর্জাতিক স্বীকৃতির জন্য অভিনন্দন জানান। তিনি বলেন, আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে বাংলাদেশের একজন নাগরিকের এ ধরনের অর্জন সমগ্র জাতির জন্য অত্যন্ত গৌরবের বিষয়। মানবকল্যাণ, সমাজের উন্নয়ন এবং মানুষের জীবনমান পরিবর্তনে নিবেদিত ব্যক্তিদের কাজের আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি দেশের অন্যদেরও জনকল্যাণমূলক কাজে উৎসাহিত করবে।
রুনা খানকে উদ্দেশ করে স্পিকার বলেন, ‘আপনি আমাদের দেশের সম্পদ, আমাদের ভবিষ্যৎ।’
এ সময় বাংলাদেশের আর্থসামাজিক উন্নয়ন, জনকল্যাণমূলক কার্যক্রম, মানবিক উদ্যোগ এবং পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠীর জীবনমান উন্নয়নে ব্যক্তি ও প্রাতিষ্ঠানিক উদ্যোগের ভূমিকা নিয়ে মতবিনিময় হয়।
নেত্রকোনার হাওরাঞ্চলের মানুষের দীর্ঘদিনের বঞ্চনা ও জীবনসংগ্রামের চিত্র তুলে ধরে ডেপুটি স্পিকার বলেন, এ অঞ্চলের মানুষ এখনো শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা, যোগাযোগ ও কর্মসংস্থানসহ বিভিন্ন মৌলিক সুযোগ-সুবিধা থেকে বঞ্চিত। দুর্গম যোগাযোগ ব্যবস্থা ও প্রয়োজনীয় অবকাঠামোর অভাবে তাঁদের জীবনযাত্রা অত্যন্ত কঠিন হয়ে পড়েছে।
হাওরাঞ্চলের মানুষের স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করতে একটি স্যাটেলাইট হাসপাতাল স্থাপনের ওপর গুরুত্বারোপ করেন তিনি। পাশাপাশি জরুরি রোগী পরিবহন, বিশেষ করে গর্ভবতী নারী, শিশু ও মুমূর্ষু রোগীদের দ্রুত হাসপাতালে নেওয়ার জন্য নৌ-অ্যাম্বুলেন্স বা ওয়াটার অ্যাম্বুলেন্স চালুর প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরেন।
ডেপুটি স্পিকার বলেন, জীবিকার তাগিদে হাওরাঞ্চলের অনেক মানুষ নিজ এলাকা ছেড়ে দেশের বিভিন্ন স্থানে গিয়ে রিকশা চালানোসহ নানা পেশায় যুক্ত হতে বাধ্য হচ্ছেন। অথচ একসময় এ হাওরাঞ্চল খাদ্য উৎপাদনে স্বয়ংসম্পূর্ণ ছিল। পরিকল্পিত উদ্যোগ ও সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনার অভাবে বর্তমানে এ অঞ্চলের বিপুল সম্ভাবনাকে যথাযথভাবে কাজে লাগানো যাচ্ছে না।
হাওরের জলমহাল ব্যবস্থাপনার বিষয়ে তিনি বলেন, অনেক ক্ষেত্রে সমাজের বিত্তশালী ও প্রভাবশালী ব্যক্তিরা জলমহাল ইজারা নিয়ে মাছ চাষ করছেন। অথচ প্রকৃত জেলেদের জীবিকা ও অধিকার সুরক্ষায় তাঁদের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা জরুরি। জলমহাল ব্যবস্থাপনায় সাধারণ জেলে ও স্থানীয় জনগোষ্ঠীর অধিকার প্রতিষ্ঠিত হলে তাঁদের জীবিকার সুযোগ বাড়বে এবং স্থানীয় মানুষের পুষ্টি ও খাদ্যনিরাপত্তা নিশ্চিত করা সহজ হবে।
হাওরাঞ্চলের শিক্ষা ব্যবস্থার সীমাবদ্ধতার কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, অনেক শিক্ষার্থীকে বিদ্যালয়ে যাতায়াতের জন্য প্রতিদিন দুই থেকে তিন মাইল পথ পাড়ি দিতে হয়। দুর্গম যোগাযোগ ব্যবস্থা, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের স্বল্পতা এবং প্রয়োজনীয় সুযোগ-সুবিধার অভাবে অনেক শিশু মানসম্মত শিক্ষা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। এ অবস্থার পরিবর্তনে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের অবকাঠামো উন্নয়ন, যাতায়াত ব্যবস্থা সহজীকরণ এবং শিক্ষার উপযুক্ত পরিবেশ নিশ্চিত করা প্রয়োজন।
ডেপুটি স্পিকার বলেন, হাওরকে শুধু একটি ভৌগোলিক অঞ্চল হিসেবে বিবেচনা না করে জাতীয় অর্থনীতি, খাদ্যনিরাপত্তা, মৎস্যসম্পদ ও জীববৈচিত্র্যের গুরুত্বপূর্ণ আধার হিসেবে দেখতে হবে। নেত্রকোনার মানুষের জীবনমান উন্নয়নে বিভিন্ন জনকল্যাণমূলক ও উন্নয়নমূলক প্রকল্প গ্রহণের পাশাপাশি এলাকার মানুষের প্রয়োজন ও বাস্তবতা বিবেচনায় কার্যকর উদ্যোগ নিতে হবে।
জবাবে রুনা খান হাওরাঞ্চলের মানুষের জীবনমান উন্নয়নে ডেপুটি স্পিকারের আন্তরিক উদ্যোগ ও ভাবনার প্রশংসা করেন। তিনি বলেন, সমাজের পিছিয়ে পড়া ও সুবিধাবঞ্চিত মানুষের জীবনমান পরিবর্তনে সম্মিলিত উদ্যোগের কোনো বিকল্প নেই। বিশেষ করে হাওরাঞ্চলের মানুষের স্বাস্থ্যসেবা, শিক্ষা, কর্মসংস্থান ও মৌলিক অধিকার নিশ্চিত করার বিষয়গুলো অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা প্রয়োজন।
রুনা খান নেত্রকোনার হাওরাঞ্চলের মানুষের জীবনমান উন্নয়ন, স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিতকরণ, শিক্ষা ও কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টিসহ জনকল্যাণমূলক বিভিন্ন উদ্যোগ বাস্তবায়নে তাঁর প্রতিষ্ঠান ফ্রেন্ডশিপের পক্ষ থেকে সার্বিক সহযোগিতার আশ্বাস দেন। এ ক্ষেত্রে স্থানীয় জনগণের প্রয়োজন ও বাস্তবতাকে প্রাধান্য দিয়ে ডেপুটি স্পিকারসহ সংশ্লিষ্ট সবার সঙ্গে সমন্বয়ের মাধ্যমে কাজ করার আগ্রহ প্রকাশ করেন তিনি।