জাতীয় স্বার্থে সমন্বিত বন্দর কৌশল প্রণয়ন করছে সরকার: নৌপরিবহনমন্ত্রী
রাজধানীর একটি হোটেলে নৌপরিবহন মন্ত্রণালয় আয়োজিত এক সেমিনারে নৌপরিবহনমন্ত্রী শেখ রবিউল আলম। ছবি: আজকের পত্রিকা
আজ রোববার (১১ অক্টোবর) রাজধানীর একটি হোটেলে নৌপরিবহন মন্ত্রণালয় আয়োজিত এক সেমিনারে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।
নৌপরিবহনমন্ত্রী বলেন, বাংলাদেশের আমদানি-রপ্তানি ও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের বড় অংশ সমুদ্রবন্দর, নদীবন্দর ও স্থলবন্দর ব্যবস্থাপনার সঙ্গে যুক্ত। জাতীয় বন্দর কৌশল প্রণয়নের ক্ষেত্রে কোনো নির্দিষ্ট সংস্থা বা মন্ত্রণালয়ের কর্তৃত্ব ও দায়িত্বকে খাটো করে দেখা যাবে না।
সংশ্লিষ্ট সব মন্ত্রণালয়, বন্দর কর্তৃপক্ষ, সরকারি সংস্থা, ব্যবসায়ী, আমদানি-রপ্তানিকারক ও বিশেষজ্ঞদের মতামতের ভিত্তিতে দেশের বৃহত্তর অর্থনৈতিক স্বার্থকে অগ্রাধিকার দেওয়ার কথা বলেন মন্ত্রী।
শেখ রবিউল আলম আরও বলেন, বাংলাদেশের জন্য একটি সমন্বিত বন্দর ব্যবস্থাপনা কৌশল অনেক আগেই প্রয়োজন ছিল। অর্থনীতি ও বাণিজ্যের অগ্রগতির সঙ্গে বন্দরগুলোর সক্ষমতা বৃদ্ধি, পরিচালনব্যবস্থার উন্নয়ন এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষগুলোর মধ্যে সমন্বয় জোরদার জরুরি হয়ে পড়েছে।
বিদ্যমান আইনগত দায়িত্ব ও কাঠামোর মধ্যে থেকেই পারস্পরিক সহযোগিতা বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দেন শেখ রবিউল আলম।
দেশের সমুদ্রবন্দর, নদীবন্দর ও স্থলবন্দর পৃথক কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে পরিচালিত হয় উল্লেখ করে মন্ত্রী বলেন, এসব বন্দরের কার্যক্রমের সঙ্গে নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়, বাণিজ্য মন্ত্রণালয়, জাতীয় রাজস্ব বোর্ড, কাস্টমস এবং আমদানি-রপ্তানির সঙ্গে যুক্ত সরকারি-বেসরকারি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের সম্পর্ক রয়েছে।
দীর্ঘদিনের এই প্রয়োজন পূরণে সরকার এখন জাতীয় বন্দর কৌশল চূড়ান্ত করার দিকে এগোচ্ছে বলে জানান নৌপরিবহনমন্ত্রী।
জাতীয় বন্দর কৌশল প্রণয়নে জাপান আন্তর্জাতিক সহযোগিতা সংস্থা জাইকা ও সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা সহযোগিতা করছেন বলে জানান শেখ রবিউল আলম।
দেশি-বিদেশি বিশেষজ্ঞদের মতামত ও অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে কার্যকর কৌশলপত্র তৈরি সম্ভব হবে বলেও আশা প্রকাশ করেন তিনি।
নৌপরিবহনমন্ত্রী বলেন, জাতীয় বন্দর কৌশল প্রণয়নে রাষ্ট্রের বৃহত্তর স্বার্থকে অগ্রাধিকার দিতে হবে। কোনো মন্ত্রণালয় বা সংস্থার নিজস্ব কর্তৃত্ব, দায়িত্ব কিংবা প্রাতিষ্ঠানিক অবস্থান যেন সমন্বিত উদ্যোগের পথে বাধা না হয়, সে বিষয়ে সতর্ক থাকার আহ্বান জানান তিনি।
বন্দরের উন্নয়নকে শুধু অবকাঠামো নির্মাণে সীমাবদ্ধ না রেখে টার্মিনাল পরিচালনা, কনটেইনার হ্যান্ডলিং, পণ্য খালাস, পরিবহন সংযোগ, কাস্টমস কার্যক্রম ও সংশ্লিষ্ট সেবাগুলোর মধ্যে সমন্বয় বাড়ানোর তাগিদ দেন নৌপরিবহনমন্ত্রী।
শেখ রবিউল আলম বলেন, জাতীয় বন্দর কৌশল কেবল একটি মন্ত্রণালয় বা নির্দিষ্ট কর্তৃপক্ষের বিষয় নয়। দেশের অর্থনৈতিক সম্ভাবনা কাজে লাগানো এবং বাণিজ্য সম্প্রসারণে এ কৌশলের গুরুত্ব অনেক বেশি।
জাতীয় বন্দর কৌশল প্রণয়নে সব পক্ষের মতামত নেওয়া প্রয়োজন বলেও মন্তব্য করেন মন্ত্রী। তিনি বলেন, কোনো একক পক্ষের স্বার্থকে প্রাধান্য দিয়ে কৌশলপত্র তৈরি করা হলে কাঙ্ক্ষিত ফল অর্জনে বাধা সৃষ্টি হতে পারে। বন্দর ব্যবস্থাপনার সঙ্গে যুক্ত প্রতিষ্ঠান ও অংশীজনের দায়িত্ব, প্রয়োজন ও স্বার্থ বিবেচনায় নিয়ে সমন্বিত কাঠামো গড়ে তোলার ওপর জোর দেন তিনি।
আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে দেশের বন্দরগুলোর দক্ষতা বাড়ানোর সুযোগ রয়েছে বলে মন্তব্য করেন নৌপরিবহনমন্ত্রী। ডিপি ওয়ার্ল্ড, ডেনমার্কের এপি মোলার এবং সিঙ্গাপুরের পিএসএ-সংশ্লিষ্ট উদ্যোগের কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, এ ধরনের উদ্যোগের সুফল পেতে সমন্বিত নীতি ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা প্রয়োজন।
দেশের বিভিন্ন বন্দরের কনটেইনার পরিচালনা ও টার্মিনাল ব্যবস্থাপনায় আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানের অংশগ্রহণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে বলেও জানান মন্ত্রী।
বন্দর ব্যবস্থাপনায় দক্ষতা বাড়লে আমদানি-রপ্তানি কার্যক্রম সহজ হওয়ার পাশাপাশি সামগ্রিক অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে ইতিবাচক প্রভাব পড়বে বলে উল্লেখ করেন শেখ রবিউল আলম। বন্দরকেন্দ্রিক পরিবহন, সরবরাহব্যবস্থা, ব্যবসা-বাণিজ্য ও উদ্যোক্তাদের কার্যক্রম আরও গতিশীল হওয়ার সুযোগ তৈরি হবে বলেও বলেন তিনি।
সেমিনারে নৌপরিবহন প্রতিমন্ত্রী মো. রাজিব আহসান, নৌপরিবহন সচিব জাকারিয়া, বাংলাদেশে জাইকার কান্ট্রি ডিরেক্টর মিস তাকাহাশি, চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষসহ বিভিন্ন বন্দরের চেয়ারম্যান, সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ও দপ্তরের প্রতিনিধি এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ও বিশেষজ্ঞরা উপস্থিত ছিলেন।
সেমিনারে অংশ নেওয়া দেশি-বিদেশি বিশেষজ্ঞ, সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়, বন্দর কর্তৃপক্ষ ও জাইকার প্রতিনিধিদের ধন্যবাদ জানান নৌপরিবহনমন্ত্রী। জাতীয় বন্দর কৌশল প্রণয়নে সংশ্লিষ্টদের মেধা, অভিজ্ঞতা ও দক্ষতার সর্বোত্তম ব্যবহারের আহ্বানও জানান তিনি।
নৌপরিবহন প্রতিমন্ত্রী বলেন, বাংলাদেশের বন্দরগুলোর দীর্ঘ ঐতিহাসিক ঐতিহ্য রয়েছে। বহু বছর ধরে এসব বন্দরকে কেন্দ্র করে নৌযান চলাচল, ব্যবসা-বাণিজ্য ও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড পরিচালিত হয়ে আসছে।
দেশের বন্দর অবকাঠামো ও বাণিজ্যিক কার্যক্রমের পরিধি বেড়েছে উল্লেখ করে প্রতিমন্ত্রী বলেন, সময়ের চাহিদা অনুযায়ী বন্দর ব্যবস্থাপনাকে আরও উন্নত ও কার্যকর করতে হবে।
বিদ্যমান সীমাবদ্ধতা চিহ্নিত করে বাস্তবসম্মত সমাধান বের করার আহ্বান জানান নৌপরিবহন প্রতিমন্ত্রী। অবকাঠামোগত উন্নয়নের পাশাপাশি ব্যবস্থাপনার দক্ষতা বৃদ্ধি, সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর মধ্যে সমন্বয় এবং দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার ওপর গুরুত্ব দেওয়ার কথাও বলেন তিনি।
আপনার মতামত লিখুন