১৮ বছর আগে সব হারিয়েছিলেন, এখন ৪ কোটির সিনেমা বানান
নমিত মালহোত্রা। ইনস্টাগ্রাম থেকে
একটি অ্যাপল কম্পিউটার আর তিন শিক্ষকের হাত ধরে শুরু হয়েছিল যাত্রা। সেই উদ্যোগ থেকে গড়ে উঠেছে অস্কারজয়ী ভিজ্যুয়াল ইফেক্টস প্রতিষ্ঠান ডিএনইজি। এবার ভারতীয় মহাকাব্যকে আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্রের মঞ্চে নতুনভাবে তুলে ধরতে বড় বাজি ধরেছেন প্রযোজক নমিত মালহোত্রা।
মুম্বাইয়ের একটি গ্যারেজে বসে ১৯ বছর বয়সে যে স্বপ্ন দেখেছিলেন নমিত মালহোত্রা, কয়েক দশক পর সেই স্বপ্নই তাঁকে নিয়ে গেছে হলিউডের গুরুত্বপূর্ণ মঞ্চে। হাতে ছিল একটি অ্যাপল কম্পিউটার, সঙ্গে ভিডিও সম্পাদনা ও কম্পিউটার গ্রাফিকস নিয়ে কাজ করার আগ্রহ। নিজের উদ্যোগে ব্যবসা শুরু করতে পাশে পেয়েছিলেন তিন শিক্ষককে। ছোট সেই উদ্যোগের নাম ছিল ভিডিও ওয়ার্কশপ। সেখান থেকে ধাপে ধাপে গড়ে ওঠে প্রাইম ফোকাস, আর আন্তর্জাতিক ভিজ্যুয়াল ইফেক্টস জগতে প্রতিষ্ঠা পায় ডিএনইজি।
এখন নমিতের সবচেয়ে বড় স্বপ্ন ‘রামায়ণ’। পরিচালক নীতেশ তিওয়ারির এই দুই পর্বের মহাকাব্যিক সিনেমায় অভিনয় করেছেন রণবীর কাপুর, যশ, সাই পল্লবী, সানি দেওলসহ একাধিক তারকা। শুধু বড় বাজেটের ভারতীয় সিনেমা নির্মাণ নয়, ভারতীয় পুরাণের গল্পকে বিশ্বজুড়ে দর্শকের কাছে পৌঁছে দেওয়াই নমিতের লক্ষ্য।
সেই স্বপ্নেরই একটি গুরুত্বপূর্ণ ধাপ ছিল যুক্তরাষ্ট্রের লস অ্যাঞ্জেলেসে সিনেমাটির বিশেষ উপস্থাপনা। ২০২৬ সালের ২৮ অক্টোবর প্রকাশিত প্রতিবেদন অনুযায়ী, একাডেমি মিউজিয়াম অব মোশন পিকচার্সের ডেভিড গেফেন থিয়েটারে আয়োজিত অনুষ্ঠানে নমিত নিজের দীর্ঘ যাত্রার কথা তুলে ধরেন। একে তিনি তুলনা করেন ব্যক্তিগতভাবে অস্কার পাওয়ার মুহূর্তের সঙ্গে। তাঁর প্রতিষ্ঠানের অর্জন, পারিবারিক সমর্থন এবং দীর্ঘদিনের পরিশ্রম—সবকিছু মিলিয়ে এটি ছিল তাঁর কাছে এক আবেগঘন উপলক্ষ।
চলচ্চিত্রের পরিবারে জন্ম, প্রযুক্তিতে নিজের পরিচয়
নমিতের চলচ্চিত্রজগতের সঙ্গে পরিচয় অবশ্য গ্যারেজে ব্যবসা শুরুরও আগে। তিনি এমন একটি পরিবারে বড় হয়েছেন, যেখানে চলচ্চিত্র নির্মাণ ছিল পরিচিত জগৎ। তাঁর বাবা নরেশ মালহোত্রা চলচ্চিত্র প্রযোজক, আর দাদা এম এন মালহোত্রা ছিলেন চিত্রগ্রাহক। ফলে ছোটবেলা থেকেই সিনেমার নানা দিক কাছ থেকে দেখার সুযোগ পেয়েছেন তিনি। তবে পরিবারের পরিচিতির ওপর নির্ভর করে প্রচলিত পথে প্রযোজক হওয়ার বদলে নমিত বেছে নেন চলচ্চিত্র নির্মাণের পেছনে থাকা প্রযুক্তি ও কারিগরি কাজকে।
১৯৯৫ সালে ভিডিও ওয়ার্কশপ প্রতিষ্ঠার মধ্য দিয়ে তাঁর উদ্যোক্তা জীবনের শুরু। কম্পিউটার গ্রাফিকস ও সম্পাদনার কাজ দিয়ে যাত্রা শুরু করা প্রতিষ্ঠানটি ধীরে ধীরে টেলিভিশন অনুষ্ঠান ও চলচ্চিত্রের পোস্ট-প্রোডাকশনেও যুক্ত হয়। নিজের বাবার প্রতিষ্ঠান ভিডিও ওয়ার্কসের সঙ্গে ব্যবসা একীভূত করার পর ১৯৯৭ সালে তৈরি হয় প্রাইম ফোকাস।
ভারতের বিনোদনশিল্পে তখন ডিজিটাল প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ছিল। সেই পরিবর্তনকে সুযোগ হিসেবে দেখেছিলেন নমিত। শুধু সম্পাদনা বা গ্রাফিকসের কাজ করেই থেমে থাকেননি; বরং প্রযুক্তি, সৃজনশীলতা ও ব্যবসাকে এক জায়গায় আনার চেষ্টা করেছেন। পরবর্তী সময়ে প্রাইম ফোকাস ভারতের অন্যতম বড় স্বাধীন মিডিয়া সেবা প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়। ২০০৬ সালে প্রতিষ্ঠানটি ভারতের শেয়ারবাজারেও তালিকাভুক্ত হয়।
যে ঝুঁকি তাঁকে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে নিয়ে যায়
নমিতের সাফল্যের পেছনে ছিল বড় ঝুঁকি নেওয়ার মানসিকতা। ব্যবসা শুরুর কয়েক বছরের মধ্যেই উন্নত পোস্ট-প্রোডাকশন প্রযুক্তিতে বিনিয়োগের প্রয়োজন দেখা দেয়। সাম্প্রতিক এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, প্রতিষ্ঠানের আয় তখন তুলনামূলক সীমিত থাকলেও উন্নত প্রযুক্তি কেনার জন্য তিনি বড় অঙ্কের ঋণ নেন। সেই বিনিয়োগের জন্য পরিবারের সম্পত্তিও ঝুঁকিতে পড়েছিল।
পরে আন্তর্জাতিক বাজারে ব্যবসা বিস্তারের উদ্যোগ নেন তিনি। যুক্তরাজ্য ও উত্তর আমেরিকায় প্রাইম ফোকাসের কার্যক্রম বাড়ানোর মধ্য দিয়ে ভারতীয় প্রতিষ্ঠানটিকে আন্তর্জাতিক পরিসরে নিয়ে যাওয়ার পথ তৈরি হয়। ২০১৪ সালে যুক্তরাজ্যের ভিজ্যুয়াল ইফেক্টস প্রতিষ্ঠান ডাবল নেগেটিভের সঙ্গে প্রাইম ফোকাসের একীভূতকরণ ছিল সেই যাত্রার বড় মোড়। এর মধ্য দিয়েই গড়ে ওঠে ডিএনইজি।
তবে এই পথও সব সময় মসৃণ ছিল না। নমিত নিজেই জানিয়েছেন, ২০০৮ সালের আর্থিক সংকটের সময় যুক্তরাষ্ট্রে ব্যবসা সম্প্রসারণের উদ্যোগ তাঁকে বড় ধরনের আর্থিক ক্ষতির মুখে ফেলে। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, ওই সময় নিজের সম্পদের প্রায় ৯০ শতাংশ হারিয়েছিলেন তিনি। সেখান থেকে ঘুরে দাঁড়িয়ে আবার ব্যবসা বিস্তার করেন। একসময় মুম্বাইয়ের গ্যারেজে শুরু হওয়া উদ্যোগ পরিণত হয় বিভিন্ন মহাদেশে বিস্তৃত আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানে।
ডিএনইজি যেভাবে হলিউডে পরিচিত
ডিএনইজির সাফল্য শুধু একটি বা দুটি ছবিতে সীমাবদ্ধ নয়। ‘ইন্টারস্টেলার’, ‘এক্স মাকিনা’, ‘ব্লেড রানার ২০৪৯’ ও ‘ফার্স্ট ম্যান’-এর মতো সিনেমাতেও প্রতিষ্ঠানটি কাজ করেছে। জটিল কল্পবিজ্ঞান, মহাকাশ, ভবিষ্যতের নগর কিংবা বাস্তবে ধারণ করা কঠিন দৃশ্যকে বিশ্বাসযোগ্য করে তোলার ক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠানটির দক্ষতা আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্রশিল্পে আলাদা পরিচিতি তৈরি করেছে।
ডিএনইজির বিভিন্ন কাজের জন্য প্রতিষ্ঠানটি মোট আটটি একাডেমি পুরস্কার অর্জন করেছে বলে সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। এর মধ্যে সাতটি পুরস্কার এসেছে গত ১১ বছরে। এই সাফল্য নমিতের কাছে কেবল ব্যবসায়িক অর্জন নয়; তাঁর ভাষায়, বিশ্বের সেরা চলচ্চিত্র নির্মাতাদের সঙ্গে কাজ করে ভিজ্যুয়াল ইফেক্টসের ক্ষেত্রে নতুন মানদণ্ড তৈরির সুযোগও।
‘রামায়ণ’ কেন এত বড় বাজির নাম
ডিএনইজিকে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে প্রতিষ্ঠিত করার পর এবার নমিতের মনোযোগ ভারতীয় পুরাণের অন্যতম পরিচিত কাহিনি ‘রামায়ণ’-এ। তবে এই প্রকল্পকে তিনি নিছক আরেকটি বড় বাজেটের ভারতীয় সিনেমা হিসেবে দেখছেন না। তাঁর লক্ষ্য, এমন একটি চলচ্চিত্র নির্মাণ করা, যা ভারতীয় দর্শকের পাশাপাশি বিশ্বের নানা দেশের দর্শকের কাছেও আবেদন তৈরি করবে।
সিনেমাটি দুই পর্বে নির্মিত হচ্ছে। পরিচালনায় নীতেশ তিওয়ারি, যিনি ‘দঙ্গল’ ও ‘ছিছোরে’র মতো সিনেমার জন্য পরিচিত। রামের চরিত্রে রণবীর কাপুর, সীতার চরিত্রে সাই পল্লবী, রাবণের চরিত্রে যশ, হনুমানের চরিত্রে সানি দেওল ও লক্ষ্মণের চরিত্রে রবি দুবে অভিনয় করছেন।
ভারতীয় গল্প, আন্তর্জাতিক নির্মাণশৈলী
‘রামায়ণ’-এর সবচেয়ে আলোচিত দিকগুলোর একটি হলো ভারতীয় ও পশ্চিমা চলচ্চিত্রশিল্পের দক্ষতাকে একসঙ্গে কাজে লাগানো। সিনেমাটির সংগীত পরিচালনায় যুক্ত হয়েছেন অস্কারজয়ী এ আর রাহমান ও হ্যান্স জিমার। হলিউডের একাধিক বড় প্রযোজনায় কাজ করা জিমারের সঙ্গে রাহমানের এই সহযোগিতা প্রকল্পটির আন্তর্জাতিক আকর্ষণ বাড়িয়েছে।
অ্যাকশন দৃশ্য নির্মাণে যুক্ত হয়েছেন টেরি নোটারি ও গাই নরিস। আর প্রাচীন ভারতের পরিবেশ, নগর, প্রাসাদ ও বিস্তৃত ভূদৃশ্য পর্দায় ফুটিয়ে তুলতে কাজ করছেন প্রোডাকশন ডিজাইনারদের একটি আন্তর্জাতিক দল। সিনেমাটি আইম্যাক্সে মুক্তির উপযোগী করে নির্মাণ করা হচ্ছে। ভিজ্যুয়াল ইফেক্টসের দায়িত্বে রয়েছে ডিএনইজি ও রিডিফাইন।
নমিতের পরিকল্পনায় এসব আয়োজনের উদ্দেশ্য শুধু দৃশ্যের জাঁকজমক বাড়ানো নয়; বরং গল্পের আবেগ ও সাংস্কৃতিক তাৎপর্যকে এমনভাবে উপস্থাপন করা, যাতে ভিন্ন সংস্কৃতির দর্শকেরাও চরিত্রগুলোর দ্বন্দ্ব, সম্পর্ক ও সিদ্ধান্তের সঙ্গে নিজেদের যুক্ত করতে পারেন।
সাত বছরের অপেক্ষা, ৪ হাজার কোটির বাজি নিয়ে ‘রামায়ণ’
লস অ্যাঞ্জেলেসে স্বপ্নপূরণের মুহূর্ত
২০২৬ সালের ২৮ অক্টোবর লস অ্যাঞ্জেলেসের ডেভিড গেফেন থিয়েটারে ‘রামায়ণ’-এর বিশেষ উপস্থাপনা নমিতের জন্য ছিল দীর্ঘ যাত্রার এক আবেগঘন মুহূর্ত। সেখানে উপস্থিত ছিলেন সিনেমাটির পরিচালক ও প্রধান অভিনয়শিল্পীরা। নিজের বক্তব্যে তিনি মা–বাবা, স্ত্রী, সন্তান, সহকর্মী এবং ব্যবসায়িক অংশীদারদের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানান।
নমিত স্মরণ করেন, ১৯ বছর বয়সে একটি অ্যাপল কম্পিউটার নিয়ে গ্যারেজে বসে কাজ শুরু করার দিনগুলোর কথা। সেই সময় তাঁর সঙ্গে ছিলেন তিন শিক্ষক—মার্জিন, প্রকাশ ও জোসেফা। তাঁদের সহযোগিতায় শুরু হওয়া উদ্যোগ আজ আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্রশিল্পের বড় বড় প্রকল্পের সঙ্গে যুক্ত। তাঁর কাছে এই পরিবর্তনই স্বপ্নের বাস্তব রূপ।
নমিত অনুষ্ঠানে বলেন, তাঁর প্রতিষ্ঠান ও দল আটটি একাডেমি পুরস্কার জিতেছে। ক্রিস্টোফার নোলান ও ডেনিস ভিলনভের মতো পরিচালকদের সঙ্গে কাজের অভিজ্ঞতা অর্জনের পর এবার নিজের প্রযোজনায় ভারতীয় মহাকাব্যকে বিশ্বমঞ্চে তুলে ধরছেন। এ কারণেই লস অ্যাঞ্জেলেসের এই আয়োজনকে তিনি নিজের ‘অস্কার মুহূর্ত’ হিসেবে বর্ণনা করেছেন।
সামনে সবচেয়ে বড় পরীক্ষা
নমিত মালহোত্রার ব্যক্তিগত সাফল্যের গল্প যতটা অনুপ্রেরণার, ‘রামায়ণ’ প্রকল্পটি ততটাই বড় পরীক্ষা। কারণ, বিপুল বিনিয়োগ, তারকাবহুল অভিনয়শিল্পী ও বিশ্বমানের কারিগরি দল থাকলেই কোনো সিনেমা দর্শকের প্রত্যাশা পূরণ করবে, এমন নিশ্চয়তা নেই। বিশেষ করে পরিচিত ও আবেগের সঙ্গে জড়িয়ে থাকা একটি মহাকাব্যকে নতুনভাবে পর্দায় তুলে ধরার ক্ষেত্রে দর্শকের প্রত্যাশা অনেক বেশি।
ভারতে ‘রামায়ণ’-এর একাধিক টেলিভিশন ও চলচ্চিত্র সংস্করণ জনপ্রিয়তা পেয়েছে। ফলে নতুন সংস্করণটির সামনে একদিকে রয়েছে পরিচিত গল্পকে নতুন প্রজন্মের কাছে পৌঁছে দেওয়ার সুযোগ, অন্যদিকে রয়েছে পুরোনো সংস্করণের সঙ্গে তুলনার চাপ। আন্তর্জাতিক বাজারেও সিনেমাটিকে এমন দর্শকের মন জয় করতে হবে, যাঁদের অনেকের কাছেই কাহিনিটি নতুন।
প্রথম পর্বের মুক্তি ২০২৬ সালের ৫ নভেম্বর নির্ধারিত বলে সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। দ্বিতীয় পর্ব আসার কথা ২০২৭ সালে, দীপাবলির সময়।
দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস অবলম্বনে২০২৬ সালের ২৮ অক্টোবর লস অ্যাঞ্জেলেসের ডেভিড গেফেন থিয়েটারে ‘রামায়ণ’-এর বিশেষ উপস্থাপনা নমিতের জন্য ছিল দীর্ঘ যাত্রার এক আবেগঘন মুহূর্ত। সেখানে উপস্থিত ছিলেন সিনেমাটির পরিচালক ও প্রধান অভিনয়শিল্পীরা। নিজের বক্তব্যে তিনি মা–বাবা, স্ত্রী, সন্তান, সহকর্মী এবং ব্যবসায়িক অংশীদারদের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানান।
দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস অবলম্বনে
আপনার মতামত লিখুন