গঙ্গা পানি চুক্তি নবায়নে ভারতের ওপর চাপ বাড়াচ্ছে বাংলাদেশ: এএফপির প্রতিবেদন
গঙ্গা পানি চুক্তি নবায়নে ভারতের ওপর চাপ বাড়াচ্ছে বাংলাদেশ: এএফপির প্রতিবেদন
0:00 0:00

গঙ্গা পানি চুক্তি নবায়নে ভারতের ওপর চাপ বাড়াচ্ছে বাংলাদেশ: এএফপির প্রতিবেদন

বাংলাদেশ
গঙ্গা পানি চুক্তি নবায়নে ভারতের ওপর চাপ বাড়াচ্ছে বাংলাদেশ: এএফপির প্রতিবেদন

ফাইল ছবি

নিউজ ডেস্ক
২৮ অক্টোবর ২০২৬, ১১:২৩ পিএম

ভারতের সঙ্গে ৩০ বছর মেয়াদি গঙ্গার পানি বণ্টন চুক্তির মেয়াদ চলতি বছরের ১২ ডিসেম্বর শেষ হচ্ছে। চুক্তির মেয়াদ শেষ হওয়ার আগে নতুন সমঝোতায় পৌঁছাতে ভারতকে আলোচনায় বসতে জোর দিচ্ছে বাংলাদেশ। নতুন চুক্তি না হলে শুষ্ক মৌসুমে পানিসংকট আরও তীব্র হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। এতে কৃষি, মৎস্যসম্পদ, পরিবেশ ও কোটি কোটি মানুষের জীবিকা হুমকির মুখে পড়তে পারে।

বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের উপদেষ্টা ও পানি বণ্টনবিষয়ক কারিগরি কমিটির প্রধান রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর বলেছেন, নতুন চুক্তি হতে হবে ‘পারস্পরিক সুবিধা ও সম্মানের’ ভিত্তিতে। তবে চুক্তি নবায়নের বিষয়ে বাংলাদেশের অনুরোধের জবাবে ভারত এখনো সাড়া দেয়নি বলে জানিয়েছে ঢাকা।

১৯৯৬ সালে স্বাক্ষরিত গঙ্গার পানি বণ্টন চুক্তির আওতায় ভারতের ফারাক্কা ব্যারাজে শুষ্ক মৌসুমে দুই দেশের মধ্যে পানি বণ্টন নির্ধারিত হয়। বাংলাদেশের সীমান্ত থেকে প্রায় ২০ কিলোমিটার উজানে অবস্থিত ২ দশমিক ২ কিলোমিটার দীর্ঘ এই ব্যারাজটি ভারত ১৯৭৫ সালে চালু করে। এরপর থেকেই গঙ্গার পানি বণ্টন নিয়ে দুই দেশের মধ্যে বিরোধ চলে আসছে।

বাংলাদেশ–ভারত যৌথ নদী কমিশনের সাবেক সদস্য মালিক ফিদা এ খান অভিযোগ করেছেন, ভারত গঙ্গার উজানে অতিরিক্ত বাঁধ নির্মাণ করেছে। তাঁর মতে, নতুন চুক্তিতে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব বিবেচনায় নেওয়ার পাশাপাশি পুরো নদী অববাহিকার পানিপ্রবাহ ও চাহিদাকে গুরুত্ব দিতে হবে।

পানি বণ্টন নিয়ে দীর্ঘদিনের বিরোধ

ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যে ৫৪টি অভিন্ন নদীর পানি বণ্টন নিয়ে কয়েক দশক ধরে বিরোধ চলছে। এর মধ্যে গঙ্গা অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ। ১৯৭৫ সালে ফারাক্কা ব্যারাজ চালুর পর বাংলাদেশ অভিযোগ করে, ভারত গঙ্গার পানির সিংহভাগ অন্যদিকে সরিয়ে নিচ্ছে। বিরোধ নিষ্পত্তিতে জাতিসংঘের হস্তক্ষেপের পর ১৯৭৭ সালে দুই দেশের মধ্যে একটি পানি বণ্টন চুক্তি হয়। তবে এক দশক পর সেই ব্যবস্থা কার্যকারিতা হারায়।

ঢাকাভিত্তিক পরিবেশবাদী সংগঠন রিভারাইন পিপলের শেখ রোকন বলেছেন, চুক্তি না থাকার সময়ে গঙ্গার পানিপ্রবাহের সংকট ভয়াবহ আকার ধারণ করেছিল। তখন অন্তত তিনটি নদী প্রায় শুকিয়ে যায়। এর মধ্যে গড়াই নদীও ছিল, যা সুন্দরবনে মিঠাপানি সরবরাহ করে এবং সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধির কারণে লবণাক্ত পানির অনুপ্রবেশ সীমিত রাখতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।

ঢাকা-নয়াদিল্লি সম্পর্কে অস্বস্তি

শেখ রোকনের আশঙ্কা, এবার চুক্তি নবায়নে ব্যর্থ হলে পরিস্থিতি অতীতের চেয়েও খারাপ হতে পারে। কারণ, বর্তমানে ভারত ও বাংলাদেশ উভয় দেশেই মিঠাপানির চাহিদা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে।

গঙ্গার পানি বণ্টন চুক্তি নবায়নের আলোচনা এমন এক সময়ে এগোচ্ছে, যখন ভারত ও বাংলাদেশের সম্পর্কেও টানাপোড়েন চলছে। ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানের পর বাংলাদেশের সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ভারতে পালিয়ে যান। দীর্ঘদিনের মিত্র ভারতে তিনি এখনো অবস্থান করছেন। মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে অনুপস্থিতিতে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত শেখ হাসিনা আগামী ডিসেম্বরে ভারত থেকে বাংলাদেশে ফেরার অঙ্গীকার করেছেন। একই মাসে তাঁর স্বাক্ষর করা গঙ্গার পানি বণ্টন চুক্তির মেয়াদ শেষ হচ্ছে।

কৃষি ও জীবিকায় বাড়ছে ঝুঁকি

বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান চুক্তির মেয়াদ শেষ হওয়ার আগে ভারত সফর করতে পারেন বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে বলা হয়েছে। তবে এ বিষয়ে এখনো আনুষ্ঠানিক ঘোষণা আসেনি। ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, নদীসংক্রান্ত বিষয়ে আলোচনা যৌথ নদী কমিশনের আওতাভুক্ত। কমিশনের সর্বশেষ কারিগরি বৈঠক হয়েছে গত মে মাসে। তবে মন্ত্রী পর্যায়ে সর্বশেষ আনুষ্ঠানিকভাবে নিশ্চিত হওয়া বৈঠকটি হয়েছিল ২০২২ সালে। এর আগে ১২ বছর কমিশনের মন্ত্রী পর্যায়ে কোনো বৈঠক হয়নি। অন্যদিকে, অভিন্ন তিস্তা নদীর পানি বণ্টন নিয়ে প্রস্তাবিত চুক্তি ২০১১ সাল থেকে আটকে রয়েছে।

গঙ্গায় পানিপ্রবাহ কমে যাওয়ার প্রভাব ইতোমধ্যে বাংলাদেশের উত্তরাঞ্চলের কৃষি ও মৎস্যসম্পদে পড়েছে। বরেন্দ্র অঞ্চলের ৭২ বছর বয়সী ধর্মযাজক বিকাশ সরেনের স্মৃতিতে এখনো রয়েছে সেই সময়ের কথা, যখন গঙ্গায় সারা বছর বড় বড় নৌকা চলত। বর্তমানে বছরের প্রায় তিন মাস নদীতে পানির প্রবাহ প্রায় দেখাই যায় না বলে তিনি জানিয়েছেন। বিকাশ সরেন বলেন, গত মৌসুমে পানির স্তর কমে যাওয়ায় ধান ও গমের ফসল নষ্ট হয়ে দুই কৃষক আত্মহত্যা করেন।

নদীতে পানির প্রবাহ কমে যাওয়ায় মাছের প্রাপ্যতাও কমেছে। ৫৫ বছর বয়সী কৃষক আবু বকর সিদ্দিক জানিয়েছেন, আগে তিনি নদীতে বিভিন্ন প্রজাতির মাছ ধরতেন। এখন জীবিকার প্রয়োজনে পুকুরে মাছ চাষ করছেন। তাঁর প্রশ্ন, নদীতে মাছ না থাকলে মানুষ মাছ পাবে কোথায়?

বিশ্বব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২ হাজার ৫২৫ কিলোমিটার দীর্ঘ গঙ্গা বিশ্বের সবচেয়ে জনবহুল নদী অববাহিকার মধ্য দিয়ে প্রবাহিত হয়েছে। এ অববাহিকায় ৬৫ কোটি ৫০ লাখ মানুষের বসবাস, যাঁদের মধ্যে বাংলাদেশেরই রয়েছেন ৫ কোটির বেশি মানুষ।

বাংলাদেশের বৃহত্তম গঙ্গা-কপোতাক্ষ সেচ প্রকল্পের আওতায় একসময় ৯৫৫ বর্গকিলোমিটার কৃষিজমিতে সেচ দেওয়ার পরিকল্পনা ছিল। কিন্তু পানির অভাবে প্রকল্পটি কার্যত অচল হয়ে পড়েছিল বলে জানান শেখ রোকন। রাষ্ট্রীয় সংবাদ সংস্থা বাসসের তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে প্রকল্পটির আওতাধীন জমির পরিমাণ কমে ৫৫০ বর্গকিলোমিটারে দাঁড়িয়েছে।

পানিসংকট মোকাবিলায় গত মে মাসে বাংলাদেশ সরকার ২৮০ কোটি ডলারের পদ্মা ব্যারাজ প্রকল্পের অনুমোদন দিয়েছে। প্রকল্পটির লক্ষ্য পানির ঘাটতি কমানো। এতে ১১৩ মেগাওয়াট ক্ষমতাসম্পন্ন একটি জলবিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণের পরিকল্পনাও রয়েছে।

জলবায়ু পরিবর্তনে বাড়ছে সংকট

বাংলাদেশের কৃষিনির্ভর অর্থনীতি ইতোমধ্যে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে চাপে রয়েছে। নদীর প্রবাহের ধরন বদলে যাওয়ায় শুষ্ক মৌসুমে পানির সংকট বাড়ছে। অন্যদিকে, বর্ষায় তীব্র বন্যায় কৃষিজমি ও গ্রাম ভেসে যাচ্ছে।

চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলায় সাম্প্রতিক বছরগুলোতে নদীর প্রশস্ততা প্রায় তিন কিলোমিটার বেড়েছে, অর্থাৎ নদীটির আকার প্রায় দ্বিগুণ হয়েছে বলে জানিয়েছে পানি উন্নয়ন বোর্ড। জেলার ফিল্ডার বাজার গ্রামের ৫০ বছর বয়সী রেহানা খাতুন জানিয়েছেন, বন্যার পানিতে তাঁর বাড়ি ধ্বংস হয়ে যাওয়ার সময় নদীর গর্জন ছিল ভয়াবহ। তিনি বলেন, নদীটি হিংস্র রূপ নিয়ে তীরবর্তী সবকিছু গ্রাস করতে শুরু করেছিল। বাড়িঘর হারিয়ে এখন তিনি বাঁশের তৈরি একটি আশ্রয়ে বসবাস করছেন। রেহানা খাতুন বলেন, বন্যার পানি নেমে যাওয়ার পরও শিশুদের মনে সেই ভয়াবহ অভিজ্ঞতার মানসিক ক্ষত দীর্ঘদিন থেকে যায়।

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূতত্ত্ব বিভাগের অধ্যাপক চৌধুরী সারওয়ার জাহান সতর্ক করে বলেছেন, নদীতে পর্যাপ্ত পানি না থাকলে এর পরিণতি বিপর্যয়কর হতে পারে।

১৯৯৬ সালের গঙ্গার পানি বণ্টন চুক্তিতে মেয়াদ স্বয়ংক্রিয়ভাবে বাড়ানোর কোনো বিধান নেই। ফলে আগামী ১২ ডিসেম্বরের আগে নতুন সমঝোতায় পৌঁছাতে না পারলে বাংলাদেশে শুষ্ক মৌসুমের পানিসংকট আরও গভীর হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। এর প্রভাব শুধু কৃষি উৎপাদনে সীমাবদ্ধ থাকবে না; মৎস্যসম্পদ, সুন্দরবনের পরিবেশগত ভারসাম্য এবং নদীতীরবর্তী কোটি কোটি মানুষের জীবন-জীবিকাও এর ফলে ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।

বিষয়:

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত