পদ্মা সেতু চালুর পর টানা পাঁচ বছর লোকসানে বিআইডব্লিউটিসি
পদ্মা সেতু চালুর পর থেকে টানা পাঁচ বছর লোকসান গুনছে বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন করপোরেশন (বিআইডব্লিউটিসি)। এ সময়ে সংস্থাটির মোট লোকসান দাঁড়িয়েছে ১৩৭ কোটি টাকার বেশি। ফেরি চলাচলের গুরুত্বপূর্ণ মাওয়া-কাঁঠালবাড়ী রুট বন্ধ হয়ে যাওয়া, উপকূলীয় যাত্রীবাহী সার্ভিসে লোকসান এবং ফেরি রুটের নাব্যতা সংকটকে আর্থিক ক্ষতির অন্যতম কারণ হিসেবে উল্লেখ করেছে সংস্থাটি।
জাতীয় সংসদে গত রোববার অনুষ্ঠিত নৌপরিবহন মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় কমিটিতে দেওয়া এক প্রতিবেদনে এ তথ্য তুলে ধরা হয়েছে।
বিআইডব্লিউটিসির তথ্য অনুযায়ী, পদ্মা সেতু চালুর পর ২০২২ সালের ২৫ জুন থেকে মাওয়া-কাঁঠালবাড়ী ফেরি সার্ভিস বন্ধ রয়েছে। একসময় এই রুটে বিপুলসংখ্যক যানবাহন পারাপার হতো। রুটটি বন্ধ হয়ে যাওয়ায় সংস্থাটি আয়ের বড় একটি উৎস হারিয়েছে। পদ্মা সেতু চালুর পর সংস্থাটি অলাভজনক প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়েছে বলেও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
বিআইডব্লিউটিসির দেওয়া পাঁচ অর্থবছরের আয়-ব্যয়ের হিসাব অনুযায়ী, ২০২১-২২ অর্থবছরে সংস্থাটির আয় ছিল ৪৩৮ কোটি ৫৯ লাখ টাকা, ব্যয় ৪৪০ কোটি ৮৬ লাখ টাকা। ওই বছর লোকসান হয় ২ কোটি ২৭ লাখ টাকা। ২০২২-২৩ অর্থবছরে আয় কমে দাঁড়ায় ৩৬০ কোটি টাকা। ব্যয় হয় ৪০০ কোটি ১০ লাখ টাকা। লোকসান হয় ৩৯ কোটি ৮০ লাখ টাকা।
ফেরিতে সবচেয়ে বেশি আয় পাটুরিয়া-দৌলতদিয়া রুটে
সরকারের কাছে ভর্তুকি পাওনা ৩৬০ কোটি টাকা
সংস্থাটির মতে, ফেরি রুটের নাব্যতা সংকটও পরিচালন ব্যয় বাড়াচ্ছে। নাব্যতা কমে গেলে ফেরিগুলোকে ঘুরে গন্তব্যে যেতে হয়। এতে সময় ও জ্বালানি খরচ বাড়ে। এ সমস্যা সমাধানে ফেরি রুটের ড্রেজিংয়ের দায়িত্ব বিআইডব্লিউটিসির অধীনে দেওয়ার প্রস্তাব করেছে সংস্থাটি।
নৌপরিবহন অধিদপ্তরের প্রতিবেদনে বলা হয়, বর্তমানে সমুদ্রগামী বাংলাদেশ পতাকাবাহী ১০৬টি জাহাজ রয়েছে। দেশি-বিদেশি জাহাজে কর্মরত নাবিক ও কর্মকর্তার সংখ্যা ১১ হাজার ৬৪ জন। এর মধ্যে নাবিক ৪ হাজার ৫৮৮ এবং কর্মকর্তা ৬ হাজার ৪৭৬ জন। এতে বাৎসরিক রেমিট্যান্স প্রায় ৪ হাজার ৪৫১ কোটি ১৫ লাখ টাকা।
জানতে চাইলে কমিটির সভাপতি জয়নুল আবদিন ফারুক গতকাল সোমবার রাতে আজকের পত্রিকাকে বলেন, ‘বিষয়টি নিয়ে আমাদের বৈঠকে আলোচনা হয়েছে। তা নিয়ে আমাদের কমিটির সদস্য মো. হাফিজ ইব্রাহিমের নেতৃত্বে পাঁচ সদস্যের কমিটি করা হয়েছে। তাঁদের দুই মাসের মধ্যে প্রতিবেদন দিতে বলা হয়েছে।’
২০২৩-২৪ অর্থবছরে আয় ছিল ৩২৫ কোটি ৪৮ লাখ টাকা এবং ব্যয় ৩৬৭ কোটি ৬৮ লাখ টাকা। এ বছর লোকসান হয় ৪২ কোটি ২০ লাখ টাকা। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ৩১৯ কোটি ৫০ লাখ টাকা আয় এবং ৩৪৭ কোটি ৬৪ লাখ টাকা ব্যয় হয়। লোকসান গুনতে হয় ২৮ কোটি ১৪ লাখ টাকা। আর ২০২৫-২৬ অর্থবছরের অনিরীক্ষিত হিসাবে আয় ৩২৮ কোটি ৪০ লাখ টাকা এবং ব্যয় ৩৫২ কোটি ৯৬ লাখ টাকা। এ বছর লোকসান হয়েছে ২৪ কোটি ৫৬ লাখ টাকা।
বিআইডব্লিউটিসির তথ্য অনুযায়ী, ২০২১-২২ থেকে ২০২৫-২৬ অর্থবছর পর্যন্ত পাঁচ বছরে বিভিন্ন ফেরি রুটে ১ কোটি ১৬ লাখের বেশি যানবাহন পারাপার হয়েছে। এ সময়ে পাটুরিয়া-দৌলতদিয়া রুট থেকে সবচেয়ে বেশি, প্রায় ৮৮১ কোটি ১৩ লাখ টাকা আয় হয়েছে। আরিচা-কাজিরহাট রুট থেকে আয় ১৪৪ কোটি ৬৮ লাখ টাকা, চাঁদপুর-শরীয়তপুর রুট থেকে ১৫৭ কোটি ১৪ লাখ টাকা, ভোলা-লক্ষ্মীপুর রুট থেকে ১০৯ কোটি ৯৭ লাখ টাকা এবং লাহারহাট-ভেদুরিয়া রুট থেকে ১২৫ কোটি ৮৯ লাখ টাকা।
অন্যদিকে, মাওয়া-কাঁঠালবাড়ী রুটে পাঁচ বছরে ৬ লাখ ১৯ হাজার ৬২০টি যানবাহন পারাপার করে আয় হয়েছিল ৩৮ কোটি ৪২ লাখ টাকা। ২০২২ সালের ২৫ জুন থেকে এ রুটে ফেরি চলাচল বন্ধ রয়েছে।
তবে নতুন রুট চালুর মাধ্যমে আয় বাড়ানোর চেষ্টা করছে সংস্থাটি। গত ৩ সেপ্টেম্বর নারায়ণগঞ্জের কাঁচপুর থেকে ভোলার ইলিশা পর্যন্ত ফেরি সার্ভিস চালু করা হয়েছে। গত অক্টোবর পর্যন্ত এ রুটে ১ হাজার ৩২০টি যানবাহন পারাপার করে ১ কোটি ৬৫ লাখ ৩৭ হাজার ৯০০ টাকা আয় হয়েছে।
বিআইডব্লিউটিসির আর্থিক সংকটের অন্যতম কারণ উপকূলীয় যাত্রীবাহী সার্ভিসের লোকসান। সংস্থাটি বলছে, উপকূলীয় অঞ্চলের মানুষের সঙ্গে মূল ভূখণ্ডের যোগাযোগ রক্ষায় জনস্বার্থে লোকসান দিয়ে এসব সার্ভিস পরিচালনা করতে হয়। প্রকৃত লোকসানের বিপরীতে ভর্তুকি দেওয়ার সিদ্ধান্ত থাকলেও সরকার প্রতিবছর থোক বরাদ্দ হিসেবে মাত্র ৫০ লাখ টাকা দেয়। এতে ২০২৫ সালের ৩০ জুন পর্যন্ত সরকারের কাছে সংস্থাটির ভর্তুকি পাওনা দাঁড়িয়েছে ৩৬০ কোটি ৪৬ লাখ টাকা।
একই সময়ে সরকারের কাছে বিআইডব্লিউটিসির ঋণ রয়েছে ৭১৭ কোটি ৬ লাখ টাকা। এ ঋণের বিপরীতে প্রতিবছর ১৫ কোটি টাকা ঋণ পরিশোধের দায় (ডিএসএল) হিসেবে সরকারি কোষাগারে জমা দিতে হয়। গত পাঁচ বছরে এ খাতে ৪৭ কোটি ৫০ লাখ টাকা পরিশোধ করেছে সংস্থাটি।
এ পরিস্থিতিতে সরকারের কাছে ঋণ ও ভর্তুকি বাবদ পাওনা সমন্বয়ের প্রস্তাব দিয়েছে বিআইডব্লিউটিসি। পাশাপাশি বার্ষিক ভর্তুকি ৫০ লাখ টাকা থেকে বাড়িয়ে ৫ কোটি টাকা করার প্রস্তাবও দিয়েছে। প্রস্তাবটি অর্থ মন্ত্রণালয়ের অর্থ বিভাগের বিবেচনাধীন রয়েছে।
আপনার মতামত লিখুন