সংসদীয় কমিটির বৈঠক: বিমানের টিকিটের দাম ও ফ্লাইট বিলম্ব নিয়ে প্রশ্ন
ফাইল ছবি
• অনলাইনে টিকিট না পাওয়া সত্ত্বেও ফ্লাইটে আসন ফাঁকা কেন।
• আন্তর্জাতিক রুটে ভাড়া নির্ধারণে নীতিমালা প্রণয়নের পরামর্শ।
• প্রধানমন্ত্রীর ফ্লাইটে বারবার ত্রুটি দেখা দেওয়ায় প্রশ্ন উঠেছে।
বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসের টিকিটের দাম বেশি কেন, তা জানতে চেয়েছে সংসদীয় কমিটি। আবার অনলাইনে টিকিট না পাওয়া সত্ত্বেও ফ্লাইটে আসন ফাঁকা কেন থাকে এবং ফ্লাইট কেন বিলম্ব হয়, সেসব প্রশ্নও উঠেছে কমিটির বৈঠকে।
জাতীয় সংসদে গতকাল সোমবার সরকারি প্রতিষ্ঠান-সম্পর্কিত কমিটির বৈঠক হয়। বৈঠকে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনস ও বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষের আর্থিক ব্যবস্থাপনা, পরিচালন কার্যক্রম ও নিরীক্ষা প্রতিবেদন পর্যালোচনা করা হয় বলে বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়েছে।
এ ছাড়া সূত্র জানায়, প্রধানমন্ত্রীকে বহনকারী উড়োজাহাজে বারবার ত্রুটি ও বিমানের ৭৩৬ কোটি টাকার অডিট আপত্তি নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে কমিটি।
আর চেক-ইন কাউন্টার ও বোর্ডিং গেটের সংকট, ব্যাগেজ ব্যবস্থাপনায় সীমাবদ্ধতা এবং স্থায়ী ইউএলডি ইয়ার্ড না থাকাকে ফ্লাইট বিলম্বের কারণ হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে বিমানের উপস্থাপন করা প্রতিবেদনে।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, বৈঠকে কমিটির পক্ষ থেকে বলা হয়, কুয়ালালামপুর থেকে ম্যানিলার দূরত্বের সঙ্গে ঢাকা থেকে কুয়ালালামপুরের দূরত্ব প্রায় সমান। অথচ ঢাকা-কুয়ালালামপুর রুটের টিকিটের দাম কুয়ালালামপুর-ম্যানিলা রুটের তুলনায় কয়েক গুণ বেশি। এই তারতম্যের কারণ এবং ভাড়া নির্ধারণে কোনো নীতিমালা রয়েছে কি না, তা জানতে চায় কমিটি।
জবাবে জানানো হয়, আন্তর্জাতিক গন্তব্যে উড়োজাহাজের ভাড়া নির্ধারণের ক্ষেত্রে বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষের (বেবিচক) কোনো নীতিমালা নেই। এয়ারলাইনস কোম্পানিগুলো নিজেরাই ভাড়া নির্ধারণ করে। পরে ভাড়া নির্ধারণে নীতিমালা করা যায় কি না, তা দেখার পরামর্শ দেয় কমিটি।
জাপান সফর শেষে দেশে ফেরার পথে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে বহনকারী বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসের উড়োজাহাজে যান্ত্রিক ত্রুটি দেখা দেওয়ায় প্রায় পাঁচ ঘণ্টা বিলম্ব হয়। গত ২৯ অক্টোবর নারিতা আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে ঢাকার উদ্দেশে উড্ডয়নের প্রস্তুতিকালে উড়োজাহাজটিতে ত্রুটি ধরা পড়ে।
ডিপারচার ব্যাগেজ এলাকায় জায়গার সংকট এবং আগমনী ব্যাগেজ বেল্টের স্বল্পতায় লাগেজ ব্যবস্থাপনায় বিলম্ব হয় বলে প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে। এতে বলা হয়, একসঙ্গে ১০ থেকে ১২টি ফ্লাইট এলে এই সমস্যা বাড়ে। স্থায়ী ইউএলডি ইয়ার্ড না থাকায় বিমান ও বিদেশি এয়ারলাইনসগুলোর ইউএলডি ব্যবস্থাপনা ব্যাহত হচ্ছে, হচ্ছে আর্থিক ক্ষতিও। এ ছাড়া রিমোট বে বরাদ্দে বে নম্বর উল্লেখ না করা এবং জিএসই রাখার নির্দিষ্ট স্থান না থাকায় গ্রাউন্ড হ্যান্ডলিংয়ে বিলম্ব হয়।
বৈঠকে গত ১০ অর্থবছরে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসের আয়-ব্যয়ের হিসাব তুলে ধরা হয়। এতে দেখা যায়, ২০১৭-১৮ অর্থবছরে ২০১ কোটি ৪৭ লাখ এবং ২০১৯-২০ অর্থবছরে ৮১ কোটি ১৩ লাখ টাকা লোকসান হয়েছে। বাকি অর্থবছরগুলোতে লাভ করেছে বিমান। এর মধ্যে সর্বশেষ ২০২৫-২৬ অর্থবছরে সর্বোচ্চ ৮২২ কোটি ৩৪ লাখ টাকা (নিরীক্ষাধীন) লাভ হয়েছে বলে জানানো হয়। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে লাভ ছিল ৭৮৫ কোটি এবং ২০২৩-২৪ অর্থবছরে ২৮২ কোটি টাকা।
কমিটির সভাপতি ও চিফ হুইপ নূরুল ইসলাম মনির সভাপতিত্বে বৈঠকে আরও উপস্থিত ছিলেন কমিটির সদস্য ও হুইপ মিয়া নুরুদ্দিন আহাম্মেদ অপু, হুইপ মো. আখতারুজ্জামান মিয়া, খোন্দকার আবু আশফাক, মোহাম্মদ কয়ছর আহমেদ, বিশ্বাস জাহাঙ্গীর আলম, মোহাম্মদ নাজিবুর রহমান এবং মোহাম্মদ কামাল হোসেন।
প্রধানমন্ত্রীর ফ্লাইটে ত্রুটির বিষয়টিও বৈঠকে আলোচনায় আসে। এর আগেও এ ধরনের সমস্যা হওয়ায় বারবার কেন এমন ঘটনা ঘটছে, তা জানতে চায় কমিটি।
জবাবে বিমানের পক্ষ থেকে বলা হয়, প্রধানমন্ত্রীর ভ্রমণের জন্য সব সময় বহরের আধুনিক উড়োজাহাজ দেওয়া হয়। এ ক্ষেত্রে আগের এক মাসের ফ্লাইট পর্যবেক্ষণ করে কোনো ধরনের ত্রুটি রয়েছে কি না, তা যাচাই করা হয়।
এ ছাড়া বিমানের উড়োজাহাজ ও যন্ত্রপাতি ক্রয়ে অনিয়মের দায় নির্ধারণ এবং আইটি ব্যবস্থার দুর্বলতায় সম্ভাব্য রাজস্ব ক্ষতির বিষয়েও আলোচনা হয়েছে।
সূত্র জানায়, ঢাকার শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের ভিআইপি লাউঞ্জের লিফট, সেবা ও পরিবেশ নিয়ে কমিটির কয়েকজন সদস্য অসন্তোষ প্রকাশ করেন। বৈঠকে একজন সদস্য বলেন, অনলাইনে বিমানের টিকিট পাওয়া যায় না। কিন্তু উড়োজাহাজে ওঠার পর অনেক আসন ফাঁকা দেখা যায়।
বৈঠকে বিমানের অডিট আপত্তি নিয়েও আলোচনা হয়। কমিটির সভাপতি জানতে চান, ঢাকা-গুয়াংজু-ঢাকা রুটে চার্টার্ড কার্গো ফ্লাইট ও রাজস্ব আদায়ে ৭৩৬ কোটি টাকার অনিয়ম কীভাবে হয়েছে। ১৮টি অডিট আপত্তির বিপরীতে প্রমাণসহ সময়সীমাবদ্ধ কর্মপরিকল্পনা দেওয়া সম্ভব কি না, তা জানতে চান তিনি।
এ ছাড়া ত্রুটিযুক্ত উড়োজাহাজ, অচল যন্ত্রপাতি, অপ্রয়োজনীয় যন্ত্রাংশ কেনা এবং পুরোনো উড়োজাহাজ কেনার ক্ষেত্রে সিদ্ধান্ত গ্রহণকারীদের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে কি না, সে বিষয়েও জানতে চায় কমিটি।
বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, বৈঠকে উত্থাপিত নিরীক্ষা আপত্তির বিপরীতে কত টাকা আদায় হয়েছে, কত টাকা অনাদায়ি রয়েছে এবং এই ঘটনায় কতজনের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে, তার বিস্তারিত তথ্য চাওয়া হয়।
বিমানবন্দরে ফ্লাইট বিলম্বের অন্যতম কারণ হিসেবে আন্তর্জাতিক ফ্লাইটের চেক-ইন কাউন্টারের স্বল্পতা, বোর্ডিং গেটে সংকট, ব্যাগেজ ব্যবস্থাপনায় সীমাবদ্ধতা এবং স্থায়ী ইউএলডি ইয়ার্ড না থাকার বিষয়গুলো প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, একসঙ্গে একাধিক আন্তর্জাতিক ফ্লাইটের চেক-ইন পরিচালনার জন্য পর্যাপ্ত কাউন্টার নেই। ফলে নির্ধারিত সময়ে কাউন্টার বন্ধ করা সম্ভব হয় না, যা ফ্লাইটের উড্ডয়ন ও সময়ানুবর্তিতা (ওটিপি) ব্যাহত করে। গেট বরাদ্দে বিলম্ব, একই গেট একাধিক ফ্লাইটে ব্যবহার এবং বোর্ডিং ব্রিজের স্বল্পতায় যাত্রী ওঠানামায় সমস্যা হয়। বিশেষ করে ৩০০ থেকে ৪০০ যাত্রী ধারণক্ষমতার ওয়াইডবডি উড়োজাহাজে বোর্ডিংয়ে বেশি সময় লাগে।
আপনার মতামত লিখুন