বাংলাদেশ সোসাইটির নির্বাচন ও হরিলুটের হাওয়া
নিউইয়র্কের আকাশে এখন শরতের হাওয়া। গাছের পাতা ঝরছে, পারদ নামছে। কিন্তু বাংলাদেশ সোসাইটির নির্বাচনী মাঠে তাপমাত্রা উল্টো পথে হাঁটছে। সেখানে পাতা নয়, ঝরছে অভিযোগ। ঠান্ডা নয়, বইছে গরম হাওয়া। আর সেই হাওয়ার নাম হরিলুট!
আলোচনায় যাবার আগে আসুন এই হরিলুট শব্দটার ঠিকুজি একটু ঘেঁটে দেখি। কারণ আমরা বাঙালিরা শব্দ ব্যবহারে যতটা উদার, শব্দের মানে জানতে ততটাই কৃপণ।
আগেকার দিনে হিন্দু সমাজে হরিনাম সংকীর্তন শেষ হলে বাতাসা, নকুলদানা আর প্রসাদ ছুড়ে দেওয়া হতো ভিড়ের মধ্যে। তারপর শুরু হতো মহাযজ্ঞ। কেউ দুই হাত বাড়িয়ে দিচ্ছে, কেউ আঁচল পেতে দিচ্ছে, কেউ হাঁটু গেড়ে মেঝে হাতড়াচ্ছে। আর কিছু প্রতিভাবান মানুষ(!) নিজে কিছু না কুড়িয়ে শুধু অন্যের মুঠোর দিকে তাকিয়ে হিসাব কষছেন, “ওর হাতে সাতটা, আমার হাতে দুটো, নিশ্চয়ই কোনো কারচুপি আছে!”
সেই বাতাসা কুড়ানোর উৎসব থেকেই জন্ম নিয়েছে “হরিলুট”। শব্দটা বহু বছর গ্রামবাংলার উঠোনে নিরীহভাবে পড়ে ছিল। তারপর একদিন সে ভিসা ছাড়াই আটলান্টিক পাড়ি দিল এবং জ্যাকসন হাইটসের ফুটপাত পেরিয়ে সোজা ঢুকে পড়ল বাংলাদেশ সোসাইটির লক্ষ ডলারের হিসাবের খাতায়। প্রবাসে এসে বাতাসা হয়ে গেল ডলার, আর সংকীর্তন হয়ে গেল নির্বাচন। বাকি সবকিছু, মানে হাত বাড়ানো, আঁচল পাতা আর অন্যের মুঠো মাপা, হুবহু একই রয়ে গেল।
সম্প্রতি কেউ কেউ প্রশ্ন তুলেছেন, সোসাইটির কয়েকলক্ষ ডলার ব্যয় নাকি হরিলুটের সামিল। অঙ্কটা শুনে সবার চোখ কপালে। কেউ বলছেন, এত টাকা! কেউ বলছেন, এ তো একটা ছোটখাটো মসজিদ-মন্দির বানানোর বাজেট! আর কেউ কেউ চুপিচুপি ক্যালকুলেটর বের করে ভাগ করছেন, মাথাপিছু আমার ভাগে কত পড়ত?
বর্তমান সভাপতি আতাউর রহমান সেলিম ও সাধারণ সম্পাদক মোহাম্মদ আলী আবারও সেই পুরোনো ‘সেলিম-আলী’ প্যানেল নিয়ে মাঠে নেমেছেন। সংবাদমাধ্যমে তাঁদের প্রচারণা আর প্রতিশ্রুতির খবরও এসেছে। ফলে অভিযোগের তীর যে বর্তমান নেতৃত্বের দিকেই উড়বে, তাতে অবাক হওয়ার কিছু নেই। নির্বাচনের মৌসুমে গদিতে যিনি বসে থাকেন, তীরের বোর্ড হিসেবে তাঁর চেয়ে সুবিধাজনক আর কেউ নেই।
কিন্তু মুশকিল হলো, তীর ছোড়া আর লক্ষ্যভেদ করা এক জিনিস নয়। আমাদের সমাজে তীরন্দাজের অভাব নেই, অভাব শুধু নিশানাবাজের। অনেকে ধনুকে টান দেন, চোখ বন্ধ করেন, তীর ছাড়েন, তারপর যেখানে গিয়ে বিঁধল সেখানে গোল দাগ কেটে ঘোষণা দেন, “দেখেছেন, একেবারে বুলস আই!”
এবার আসি কর্মকর্তাদের কথায়। তাঁদের বক্তব্য অনুযায়ী, প্রতিটি ব্যয়ের কাগজপত্র আর ব্যাংক স্টেটমেন্ট তাঁদের কাছে আছে।
এখন প্রশ্ন হলো, এই বিপুল অঙ্কের ডলার কি সত্যিই কোথাও উড়ে গেছে, নাকি শুধু অভিযোগের খাতায় জন্ম নিয়ে সেখানেই বাস করছে? বাতাসা হারালে অন্তত মেঝেতে গুঁড়ো পড়ে থাকে। কিন্তু এই বিপুল পরিমান অর্থের কোন গুঁড়োও কেউ এখনো দেখাতে পারেননি।আবার উড়িয়ে দেওয়ার মতো পরিষ্কার জবাবও টেবিলে পড়েনি।
ঠিক এখানেই ব্যাপারটা “ভজঘট”। ভজঘট মানে এমন এক জট, যেখানে সুতোর দুই মাথাই কারও হাতে নেই, অথচ সবাই দাবি করছেন তিনিই মাথাটা ধরে আছেন। অভিযোগকারী বলছেন, “হরিলুট হয়েছে!” কর্মকর্তারা বলছেন, “প্রমাণ দিন!” অভিযোগকারী বলছেন, “হিসাব দেখান!” কর্মকর্তারা বলছেন, “কাগজ তো আছেই!” আর সাধারণ সদস্যরা মাঝখানে দাঁড়িয়ে টেনিস ম্যাচের দর্শকের মতো একবার ডানে, একবার বাঁয়ে মাথা ঘোরাচ্ছেন। ঘাড় ব্যথা হচ্ছে, কিন্তু বলটা কোথায় পড়ছে কেউ দেখতে পাচ্ছেন না।
বাতাসার হরিলুট প্রমাণ করা সহজ ছিল। মেঝেতে দু-চারটে পড়ে থাকা বাতাসা দেখালেই বিচার শেষ। কিন্তু ডলারের হরিলুট প্রমাণ করতে লাগে হিসাবের খাতা, ব্যাংক স্টেটমেন্ট, চেকের মুড়ি, ভাউচার, রসিদ, আর সবচেয়ে দুর্লভ বস্তু: স্বচ্ছতা। শেষেরটা আমাদের কমিউনিটিতে এতই দুষ্প্রাপ্য যে পেলে জাদুঘরে রাখা যেত।
তাহলে সমাধান কী? সমাধান তো হাতের মুঠোয়! কর্মকর্তারা যদি বলেন কাগজ আছে, তাহলে কাগজগুলো একটা টেবিলে বিছিয়ে দিন। অভিযোগকারীরা যদি বলেন হরিলুট হয়েছে, তাহলে সেই টেবিলে এসে বসুন, চশমা মুছে পাতা উল্টান। একজন স্বাধীন অডিটর ডাকুন, সদস্যদের সামনে হিসাব পড়ে শোনান। ব্যস, গল্প শেষ। ভজঘট খুলে যাবে, বাতাস পরিষ্কার হবে।
কিন্তু আমরা তো বাঙালি! আমাদের কাছে হিসাব দেখার চেয়ে রায় দেওয়া অনেক বেশি আরামের কাজ। হিসাব দেখতে হলে চোখ খাটাতে হয়, রায় দিতে শুধু মুখ খাটালেই চলে। তাই খাতা খোলার আগেই চায়ের দোকানে আদালত বসে যায়।
প্রথমজন বলেন, “সব গেছে! দ্বিতীয়জন বলেন, “কিছুই যায়নি! সব ঠিকঠাক!”তৃতীয়জন গলা নামিয়ে বলেন, “আসলে পুরোটাই ষড়যন্ত্র, পেছনে বড় খেলোয়াড় আছে।”চতুর্থজন ফেসবুকে লাইভে এসে তিনজনের কথাই একসঙ্গে বলে ফেলেন।
আর পঞ্চমজন, যিনি বছরের পর বছর চাঁদা দিয়ে এসেছেন, এক কোণে চুপচাপ বসে ভাবেন, “আমার বাতাসাটা গেল কোথায়?”
সত্যিকারভাবে বলতে হয় বাংলাদেশ সোসাইটির কাছে থাকা অর্থ কারও ব্যক্তিগত ড্রয়ারের টাকা নয়, কারও পারিবারিক তহবিলও নয়। এটা হাজারো প্রবাসী বাংলাদেশির ঘাম, চাঁদা আর আস্থার প্রতিষ্ঠান। কেউ ট্যাক্সি চালিয়ে, কেউ রেস্টুরেন্টে ডাবল শিফট করে, কেউ দুটো চাকরি সামলে এই প্রতিষ্ঠানে টাকা দিয়েছেন। তাই অঙ্কটা লাখ হাজার যাই হোক না কেন প্রতিটি ডলারের জবাবদিহি জরুরি।
অভিযোগ যদি সত্য হয়, তাহলে প্রমাণ নিয়ে সামনে আসুন। কথার ফুলঝুরিতে বা সংবাদপত্রের বিবৃতিতে নয় ।
অভিযোগ যদি মিথ্যা হয়, হিসাব দিয়ে সেটা ধুয়ে ফেলুন। শুধু “প্রমাণ দিন” বলে নয়, নিজের খাতা খুলে তার প্রমাণ দিন।কারণ “হরিলুট হয়েছে” বলা যতটা সহজ, “হরিলুট হয়নি” বলাও ঠিক ততটাই সহজ। কঠিন কাজ একটাই: খাতাটা খোলা। আর দুঃখের বিষয়, আমাদের কমিউনিটিতে মুখ খোলার লোক অনেক, খাতা খোলার লোক খুঁজতে এখনো হারিকেন লাগে।
নির্বাচন আসবে, নির্বাচন যাবে। প্যানেল জিতবে, প্যানেল হারবে। কিন্তু সদস্যদের আস্থা একবার হরিলুট হয়ে গেলে, সেটা আর কোনো ব্যাংক স্টেটমেন্ট দিয়ে ফেরত আনা যাবেনা।
হাবিব রহমান
আপনার মতামত লিখুন