বৃস্টি দিনের খিচুরি এবং জ্যামাইকার আল আকসা রেস্টুরেন্ট
আজ রোববার।সকাল থেকেই আকাশের মুখটা ভার।দুপুর থেকেই টিপটিপ করে বৃষ্টি ঝরছিল—কখনো একটু থেমে, আবার কখনো অকারণেই ঝরঝর করে। নিউইয়র্কের শরতের দিনে এমন বৃষ্টি নামলে শহরটাও কেমন যেন বদলে যায়। ব্যস্ত রাস্তাগুলো একটু নির্জন হয়ে আসে, মানুষের হাঁটার গতি বেড়ে যায়, আর ছাতার নিচে মুখগুলো যেন আরও গম্ভীর হয়ে ওঠে।
কাজ ছিল জ্যামাইকার হিলসাইড এলাকায়। শেষ করে বাইরে বেরিয়েছি, এমন সময় আকাশ যেন হঠাৎ তার জমিয়ে রাখা সব অভিমান একসঙ্গে উজাড় করে দিল। টিপটিপ বৃষ্টি মুহূর্তেই পরিণত হলো ঝমঝম বর্ষণে।
বৃষ্টির হাত থেকে বাঁচতে প্রায় দৌড়েই ঢুকে পড়লাম পাশের আল আকসা রেস্টুরেন্টে।
ভেতরে ঢুকেই অন্য এক দৃশ্য।বৃস্টি ভেজা দুপুরেও রেস্টুরেন্টটি ক্রেতায় গমগম করছে। কেউ খাচ্ছেন, কেউ খাবার নিচ্ছেন, কেউ আবার বৃষ্টির বিরতিতে গরম খাবারের সঙ্গে গল্পে করছেন।
একটা টেবিল পাওয়া গেল। বসে ভাবলাম—বৃষ্টি থেকে আশ্রয় নিয়েছি ঠিকই, কিন্তু শুধু টেবিল দখল করে বসে থাকাটা তো ভদ্রতা নয়। কিছু একটা খেতেই হবে।
উঠে গেলাম খাবারের কাউন্টারের দিকে।
সামনে যেন ছোটখাটো এক বাঙালি খাবারের মেলা!
ভাত, পোলাও, খিচুড়ি, ডিম, মাছ, মাংস—হরেক রকমের রান্না সুন্দর করে সাজানো। তার সঙ্গে আছে বিভিন্ন ধরনের কম্বো। নির্দিষ্ট মূল্যে ভাত বা পোলাও কিংবা খিচুড়ির সঙ্গে ডিম, মাছ অথবা মাংস—পছন্দমতো মিলিয়ে নেওয়ার সুযোগ।
আর সবচেয়ে ভালো লাগল দামটা।
জ্যামাইকার ৬৯ স্ট্রিট কিংবা জ্যাকসন হাইটসের সঙ্গে তুলনা করলে বেশ সাশ্রয়ী।
কাউন্টারের পেছনে দাঁড়ানো হাসিখুশিএকজন আপা বললেন-রেডি খাবারের সঙ্গে চাইলে এই বৃস্টির দিনে গরম গরম ডিম ভাজি নিতে পারবেন।
বৃষ্টিভেজা শরীর আর মন—দুটোই যেন কথাটা শুনে একসঙ্গে সাড়া দিল।
বললাম-তাহলে খিচুড়ি আর ডিম ভাজি দিন।
কিছুক্ষণ পর টেবিলে এসে হাজির হলো আমার দুপুরের সুখ।
এক প্লেট ধোঁয়া ওঠা মুগ ডালের খিচুড়ি, তার ওপর গোল করে সুন্দর করে ভাজা ডিম। পাশে সামান্য সালাদ—শসা, লেটুস, লেবুর টুকরো।
বাইরে তখনও বৃষ্টি।
কাচের ওপারে বৃষ্টির রেখাগুলো নেমে আসছে। গাড়িগুলো ভেজা রাস্তায় ছুটে যাচ্ছে। পথচারীরা ছাতা মাথায় দ্রুত পা ফেলছেন।
আর আমি?
সামনে রাখা খিচুড়ি ভর্তি প্লেটের দিকে তাকিয়ে মনে মনে বললাম—বৃষ্টির দিনে এর চেয়ে আপন খাবার আর কী হতে পারে!
খিচুড়ির সঙ্গে আমাদের বাঙালির সম্পর্কটা একটু অন্যরকম। এটি শুধু একটি খাবার নয়—এর সঙ্গে মিশে থাকে বর্ষার দুপুর, মায়ের রান্নাঘর, জানালার কাঁচে বৃষ্টির শব্দ, গরম ভাতের ধোঁয়া আর শৈশবের কত অচেনা-চেনা স্মৃতি।
এক চামচ খিচুড়ি মুখে দিতেই যেন সেই পুরোনো দিনের দরজাটা একটু একটু করে খুলে গেল।মুগ ডালের মিষ্টি ঘ্রাণ, মশলার মৃদু স্বাদ, নরম চাল আর ডালের মিশেল—তার সঙ্গে গরম তেলে ভাজা ডিমের কুসুম। খুব সাধারণ আয়োজন, অথচ কী আশ্চর্য তৃপ্তি!
কখনো কখনো ভালো খাবারের জন্য দামি রেস্টুরেন্ট লাগে না।লাগে শুধু সঠিক সময়ে সঠিক খাবার।আজকের দিনটিও বোধহয় তেমনই ছিল।আর জ্যামাইকার আল আকসা রেস্টুরেন্ট আমাকে উপহার দিলো সেই অসাধারণ দিনটি।
খিচুড়ি শেষ করে ভাবলাম, বৃষ্টির দিনে গল্পটা এখানেই শেষ করা যায়। কিন্তু শেষ মুহূর্তে আরেকটি ছোট্ট বিলাসিতা যোগ হলো—এক কাপ গরম চা।
চায়ের কাপ হাতে নিয়ে জানালার বাইরে তাকিয়ে রইলাম কিছুক্ষণ।বৃষ্টি তখনও পড়ছে।গরম চায়ের ধোঁয়া আর জানালার ওপারে বৃষ্টির রেখা—দুটো মিলে মুহূর্তটাকে বেশ কবিতার মতো করে তুলেছিল।
তারপর এল বিল। এক মুহূর্ত তাকিয়ে রইলাম — হতবাক। মোট সাড়ে সাত ডলার। ডিম-খিচুরি ছয় ডলার, আর চা দেড় ডলার।
এত কম দামে পেট পুরে খাওয়া যায় — এই শহরে?এই নিউইয়র্কে যেখানে দু’ ডলারে এক কাপ কফি খেতে হয়, সেখানে সাড়ে সাত ডলারে পেট ভরে খাবার? ভাবাই যায় না।
ধন্যবাদ, আল আকসা রেস্টুরেন্ট কর্তৃপক্ষকে — এত সাশ্রয়ী মূল্যে, এত উপাদেয় খাবার গ্রাহকদের উপহার দেওয়ার জন্য। আর ধন্যবাদ সেই শেফকে — যিনি এত যত্ন করে, এত ভালোবাসা দিয়ে রান্না করেছেন খিচুরিটা — যেন তাঁর হাতের স্পর্শেই খাবারটা স্বাদে আর গন্ধে হয়ে উঠেছিল অনন্য।
এই শহরে সবাই যখন দাম বাড়ানোর প্রতিযোগিতায় ব্যস্ত, তখন জ্যামাইকার এক কোণে আল আকসা রেস্টুরেন্ট যেন এক ব্যতিক্রম। তারা কম লাভে বেশি মানুষকে খাওয়াতে চায়। প্রবাসী শ্রমজীবী মানুষ — যারা ট্যাক্সি চালায়, রেস্টুরেন্টে কাজ করে, ডেলিভারি দেয় — তাদের কথা ভেবে হয়ত তারা দামটা কম রেখেছে।
বাইরে তখন নিউইয়র্কের বৃষ্টি।আর আমার মনে তখন বাংলাদেশের বর্ষা।এক প্লেট খিচুড়ি যে কখনো কখনো মানুষকে হাজার মাইল দূরের বাড়িতে ফিরিয়ে নিতে পারে—আজ আবারও তার প্রমাণ পেলাম।
বৃষ্টি একসময় থেমে যাবে, দিনটাও হারিয়ে যাবে আরও অনেক দিনের ভিড়ে। কিন্তু আল আকসা রেস্টুরেন্টের এক থালা খিচুড়ির সেই উষ্ণতা হয়তো রয়ে যাবে মনের কোণে, অনেক অনেক দিন।
নিউইয়র্ক,০৪ অক্টোবর,২০২৬ সাল।
হাবিব রহমান
আপনার মতামত লিখুন