জাপান সফর শেষে দেশে ফিরলেন প্রধানমন্ত্রী
জাপানে চার দিনের সরকারি সফর শেষে দেশে ফিরেছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। ছবি: পিএমও
বৃহস্পতিবার প্রধানমন্ত্রী নাগোয়া সফর করেন এবং জাপানের অটোমোবাইল উৎপাদন সক্ষমতা প্রত্যক্ষ করতে টয়োটা মোটর কর্পোরেশনের মোতোমাচি কারখানা ও ‘টয়োটা মেমোরিয়েটিভ মিউজিয়াম অব ইন্ডাস্ট্রি অ্যান্ড টেকনোলজি’ পরিদর্শন করেন। সেখানে তিনি জাপানের অটোমোবাইল উৎপাদন সক্ষমতা প্রত্যক্ষ করেন।
প্রধানমন্ত্রীর এই সফরটি এমন এক সময়ে অনুষ্ঠিত হলো যখন বাংলাদেশ ও জাপান তাদের অর্থনৈতিক সম্পর্ক আরও সম্প্রসারণের উদ্যোগ নিয়েছে।
এটি উভয় দেশের প্রথম ‘ইকোনমিক পার্টনারশিপ এগ্রিমেন্ট’ (ইপিএ) বাণিজ্য ও বাণিজ্যিক সম্পর্ক জোরদার করার ক্ষেত্রে একটি নতুন কাঠামো প্রদান করবে।
জাপান দীর্ঘকাল ধরে বাংলাদেশের অন্যতম প্রধান উন্নয়ন সহযোগী হিসেবে কাজ করে আসছে।
তারা ঢাকা মেট্রোরেল, হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের তৃতীয় টার্মিনাল এবং মাতারবাড়ি গভীর সমুদ্রবন্দরের মতো গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো প্রকল্পগুলোতে সহায়তা প্রদান করেছে।
দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক জোরদার, বিনিয়োগ বৃদ্ধি এবং দুই দেশের মধ্যে বাণিজ্য ও অর্থনৈতিক সহযোগিতা সম্প্রসারণের লক্ষ্যে জাপানে চার দিনের সরকারি সফর শেষে দেশে ফিরেছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।
প্রধানমন্ত্রীর উপ-প্রেস সচিব শাহাদাৎ স্বাধীন জানান, প্রধানমন্ত্রী, তাঁর স্ত্রী ডা. জুবাইদা রহমান এবং তাঁর সফরসঙ্গীদের বহনকারী বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের একটি ফ্লাইট আজ শুক্রবার রাত ২ টা ৪৮ মিনিটে ঢাকার হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে অবতরণ করে।
তিনি আরও জানান, ফ্লাইটটি বৃহস্পতিবার জাপানের স্থানীয় সময় রাত ১০টা ৫৫ মিনিটে টোকিওর নারিতা আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে ঢাকার উদ্দেশে রওনা দেয়।
হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে প্রধানমন্ত্রী এসে পৌঁছালে বিমানবন্দরে তাঁকে অভ্যর্থনা জানাতে উপস্থিত ছিলেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ, বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব ও প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা অ্যাডভোকেট রুহুল কবির রিজভী, জাতীয় সংসদের চিফ হুইপ নুরুল ইসলাম মনি, মন্ত্রিপরিষদ সচিব নাসিমুল গনি, প্রধানমন্ত্রীর প্রেস সচিব সালেহ শিবলী।
জাপানের প্রধানমন্ত্রী সানায়ে তাকাইচির আমন্ত্রণে গত ২৬ থেকে ২৯ অক্টোবর পর্যন্ত জাপান সফর করেন তারেক রহমান।
সফরকালে তিনি উচ্চপর্যায়ের দ্বিপক্ষীয় আলোচনায় অংশ নেন, জাপানের রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ ও ব্যবসায়িক নেতাদের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন এবং বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ শিল্প ও জ্বালানি স্থাপনা পরিদর্শন করেন।
এ ছাড়া বাংলাদেশের জ্বালানি, অবকাঠামো এবং তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি (আইসিটি) খাতে এক ট্রিলিয়ন জাপানি ইয়েন (প্রায় ৬ দশমিক ৩ বিলিয়ন মার্কিন ডলার) বেসরকারি বিনিয়োগের প্রস্তাব নিয়েও তাঁরা আলোচনা করেন। বিনিয়োগ পরিকল্পনা বাস্তবায়নের গতি ত্বরান্বিত করতে জাপানি একটি প্রতিনিধি দলকে বাংলাদেশে পাঠানোর বিষয়েও তাঁরা আলোচনা করেন।
সফরকালে বাংলাদেশ ও জাপানের মধ্যে ছয়টি দ্বিপক্ষীয় সমঝোতা দলিল স্বাক্ষরিত হয়েছে।
পাশাপাশি মোট ৪৬ দশমিক ৫৬ বিলিয়ন জাপানি ইয়েন (প্রায় ২৯৫ দশমিক ৫ মিলিয়ন মার্কিন ডলার) মূল্যের দুটি ‘ইয়েন-লোন’ (ঋণ সহায়তা) প্রকল্পের প্রতিশ্রুতি পাওয়া গেছে।
এই চুক্তিগুলোর মধ্যে বাংলাদেশের উপকূলীয় নিরাপত্তা সক্ষমতা জোরদার করার লক্ষ্যে একটি টহল জাহাজ সংগ্রহের জন্য ২ দশমিক ১২ বিলিয়ন জাপানি ইয়েন (১৩ দশমিক ৪৪ মিলিয়ন মার্কিন ডলার) পর্যন্ত অনুদান সহায়তা সংক্রান্ত চুক্তিও অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।
উভয় দেশ ব্যবসায়িক পরিবেশের উন্নয়ন, কৃষি, দক্ষতা উন্নয়নের মাধ্যমে কর্মসংস্থান কর্মসূচি এবং মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ খাতে সহযোগিতার বিষয়ে সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষর করেছে। পাশাপাশি জলবায়ু পরিবর্তন বিষয়ক সহযোগিতার জন্য একটি ‘লেটার অব ইনটেন্ট’ বা আগ্রহপত্রও স্বাক্ষরিত হয়েছে।
ঋণ সহায়তাপুষ্ট দুটি প্রকল্পের মাধ্যমে বাংলাদেশে বিনিয়োগ পরিবেশের উন্নয়ন এবং ‘উপজেলা শাসন ও উন্নয়ন প্রকল্প’-এর দ্বিতীয় পর্যায় বাস্তবায়নে সহায়তা করা হবে।
পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী হুমায়ুন কবির জানিয়েছেন, সরকারি পর্যায়ের চুক্তির বাইরেও জাপান এক্সটার্নাল ট্রেড অর্গানাইজেশন (জেট্রো)-তে বেসরকারি খাতের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের মধ্যে ১৭টি সমঝোতা স্মারক (এমওইউ) স্বাক্ষরিত হয়েছে।
জাপানের জ্বালানি ও লজিস্টিকস অবকাঠামো সরেজমিনে দেখার উদ্দেশে প্রধানমন্ত্রী গত ২৭ অক্টোবর ফুত্তসুতে অবস্থিত ‘জেরা’-এর তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) টার্মিনাল ও বিদ্যুৎ কেন্দ্র এবং ইচিকাওয়াতে অবস্থিত ‘নিতসু’ লজিস্টিকস হাব পরিদর্শন করেন।
গত ২৮ অক্টোবর প্রধানমন্ত্রী টোকিওতে জেট্রো সদর দপ্তরে আয়োজিত ‘বাংলাদেশ-জাপান ইকোনমিক ফোরাম ডায়ালগ’-এ বক্তব্য রাখেন।
এ সময় তিনি জাপানি কোম্পানিগুলোকে বাংলাদেশের পাঁচটি অগ্রাধিকারমূলক খাত- অটোমোবাইল উৎপাদন, জ্বালানি, প্রযুক্তি ও মহাকাশ খাত, উচ্চগতির রেল ও লজিস্টিকস এবং কৃষি প্রক্রিয়াজাতকরণ শিল্পে বিনিয়োগের আহ্বান জানান।
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ব্যবসায়িক পরিবেশ উন্নয়নের লক্ষ্যে সরকারের পক্ষ থেকে প্রয়োজনীয় সহায়তা ও সংস্কারের প্রতিশ্রুতি দেন। সফরকালে তিনি জাপানের রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ, উন্নয়ন সহযোগী এবং ব্যবসায়িক নেতাদের সঙ্গেও সাক্ষাৎ করেন।
তাঁদের মধ্যে ছিলেন সাবেক প্রধানমন্ত্রী তারো আসো, জাপান ইন্টারন্যাশনাল কোঅপারেশন এজেন্সির (জাইকা) প্রেসিডেন্ট ড. আকিহিকো তানাকা, জাপান ব্যাংক ফর ইন্টারন্যাশনাল কোঅপারেশনের (জেবিআইসি) গভর্নর কাজুহিকো আমাকাওয়া এবং জেট্রোর প্রেসিডেন্ট সুসুমু কাতাওকা।
পোশাক খাতের জায়ান্ট ইউনিক্লো, মিতসুই অ্যান্ড কোং, সুমিতোমো কর্পোরেশন এবং জেরা-সহ জাপানের বড় বড় কোম্পানির প্রতিনিধিদের সঙ্গে বৈঠকে প্রধানমন্ত্রী বিনিয়োগ সম্প্রসারণ, কারখানা স্থাপন, কর্মসংস্থান সৃষ্টি, প্রযুক্তি হস্তান্তর এবং দক্ষতা উন্নয়নের সুযোগগুলো নিয়ে আলোচনা করেন।
আপনার মতামত লিখুন